Created: Wednesday, 24 October 2018 11:14 | Rate this article
( 0 Votes ) 
| Category: Articles

জীবনের বোঝা ও গবেষণার নব দিকচক্রবাল    

১ লড়াই


আমেরিকার এক প্রভাবশালী ও প্রগতিশীল সাংবাদিল জন সুইন্টন (১৮২৯-২০০১) ১৮৮০র অগাস্ট মাসে  ইয়োরোপ সফরে এসেছিলেন।১ সেখানে থাকাকালীন আমেরিকার সবচেয়ে পঠিত সংবাদপত্র ‘দি সান’ পত্রিকার (যার তিনি সম্পাদক ছিলেন)  তরফে আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলনের অন্যতম প্রধান প্রতিনিধির সাক্ষাৎকার নিতে তিনি ব্রিটিশ কেন্ট কোস্ট-এর র‍্যামসগেট-এ গিয়েছিলেন।


জন্মসূত্রে জর্মন হলেও ১৮৪৮ থেকে মার্ক্স  এক রাষ্ট্রহীন। ব্রিটেনে ১৮৭৪ সালে  তাঁর স্বাভাবিকৃত নাগরিকত্ব আবেদন নাকচ হয়ে গিয়েছিল,কারণ স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড তাঁকে ‘কমিউনিস্ট আদর্শ অবলম্বনকারী এক কুখ্যাত জর্মন প্রতিবাদী’ তকমা দিয়েছিল, ‘যার নিজের দেশ ও রাজার প্রতি আনুগত্য নেই’।২      
চিকিৎসকের নির্দেশে মার্ক্স ১৮৮০-র গ্রীষ্মে র‍্যামসগেট-এ সপরিবারে ছিলেন যাতে ‘তিনি সর্ববিধ কর্ম থেকে বিরত’ থাকতে পারেন।৩ তাঁর চেয়েও তাঁর স্ত্রীর স্বাস্থ্য খারাপ ছিল। ইয়েনি তখন কর্কট রোগাক্রান্ত এবং অবনতি এমন স্তরে পৌঁছেছিল যা প্রাণ সংশয় হয়েছিল।৪ ন্যু ইয়র্ক টাইমস-এর ১৮৬০ দশকের প্রধান সম্পাদক সুইন্টন-এর লেখায়  মার্ক্স –এর ঐ সংকটাপন্ন অবস্থার এক অনুকম্পাপূর্ণ ও নিখুঁত ছবি ফুটে উঠেছিল।
ব্যক্তি হিশেবে, তিনি মার্ক্সকে চিত্রিত করেন   তাঁর দেখা এক ‘বিশালাকার শিরসম্পন্ন ৬০ বছরের এক অবিন্যস্ত ও দীর্ঘ পক্ককেশ  উদার, সৌজন্যপূর্ণ করুণাময় মানুষ’, যাঁর ‘জ্ঞান ভিক্তর হুগোর চেয়ে কম সূক্ষ্ম ছিল না, ‘পিতামহের ধরণে’।৫ তাঁর সঙ্গে বাক্যালাপের ‘খোলামেলা,সুস্পস্টতা, সৃজনশীলতা, গভীরতা ও অকপটতা সুইন্টনের মনে পড়েছিল সক্রেটিসের কথা, বিশেষত ‘টিপ্পনির স্পর্শ, হাস্যরসাত্মক ঔজ্জ্বল্য ও খোলামেলা আনন্দোচ্ছলতা’র জন্য। ‘একজন মানুষ যাঁর খ্যাতি বা দেখানেপনায় নিরুৎসাহ, জীবনে স্তাবক পরিবৃত হবার আকাঙ্খা বা ক্ষমতার মোহ নেই’।
প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশিত প্রবন্ধটিতে মার্ক্সের জনমুখী ভাবমূর্তি তুলে সুইন্টন লিখেছিলেন , “এ কালের সেই সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক মানুষদের একজন  যিনি গত চার দশক ধরে বিপ্লবী রাজনীতি বর্নণাতীতভাবে  প্রভাবিত করেছেন। ত্বরা-ক্ষিপ্রতারহিত এক দৃঢ় ও উদারচিত্ত মানুষটি ইয়োরোপের যে কোনো জনের চেয়ে যৌক্তিক পদ্ধতিমালা ও বাস্তব লক্ষ্য-স্থির সুদূরপ্রসারী প্রকল্পভাবনা মাথায় রাখতে পারতেন ও জাতিসমূহকে ভূমিকম্পের চেয়েও দোমড়ানো-মোচড়ানো প্রতিকূলতা ও রাজা-রাজড়াদের কায়েমী প্রতারণা-উত্থিত বিপর্যয়ের মোকাবিলা করতে পারতেন.৬
মার্ক্সের ‘সময়ের গভীরতা’বোধ সুইন্টনকে মুগ্ধ করেছিল, যাঁর ‘ ব্যাপ্তি নেভা থেকে সীন।, উরাল থেকে পাইরেনিস অব্দি বিস্তৃত হয়ে নবযুগের পথ উনোচন করছে।’ তিনি ‘ইয়োরোপের একের এক দেশের সমীক্ষা করে তাদের বৈশিষ্ট্য ও বিকাশের পথ নির্দেশ করেছেন, সামনে উঠে আসা ও অন্তরালে নেতাদের কথা লিখেছেন।’ তিনি ইয়োরোপের বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক শক্তি ও জন আন্দোলনের কথা লিখেছেন – রাশিয়ার আত্মশক্তির বিশাল স্রোত ,জর্মন মানসিকতার গতিধারা, ফ্রান্সের সক্রিয়তা ও ইংল্যান্ডের স্থাবরত্ব-এর কথা। তিনি রাশিয়া সম্পর্কে আশাবাদী, জর্মনী সম্পর্কে দর্শনাত্মক, ফ্রান্স সম্পর্কে উৎফুল্ল ও ব্রিটিশ সংসদে উদারপন্থীদের ‘ক্ষুদ্রাকার সংস্কারে’ কালাতিপাতের প্রতি ঘৃণাবশে ইংল্যান্ড সম্পর্কে বিষণ্ণ।’ ৭
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে মার্ক্সের জ্ঞান সুইন্টনকে বিস্মিত করেছিলঃ তাঁর নিবিষ্ট অবলোকন ও ‘আমেরিকান জীবন যাত্রার গঠন ও মূল শক্তিগুলি সম্পর্কে  অভিভাবপূর্ণতা’।
দিনটা কাটল প্রাণবন্ত নানা আলোচনায়। অপরাহ্ণে.তাঁর পরিবারের সঙ্গে সমুদ্রসৈকতে মার্ক্স প্রস্তাব দিলেন। সুইন্টন সেই অভিজ্ঞতাকে ‘প্রায় দশজনের এক আনন্দঘন সম্মিলন আখ্যা দিয়েছিল্রন। সন্ধ্যা নামার পরে মার্ক্সের দুই জামাতা শার্ল লোঁগি ও পল লাফার্গ যোগ দিলে ‘ সমুদ্রতটে আমাদের পানপাত্রগুলির ঠুং ঠাং-এর সাথে সাথে কথাবার্তার রেশ ছড়িয়ে পড়ল দুনিয়ার পরিসরে নানা ব্যক্তি, সময় ও ভাবনা উঠে এলো।’ একজন আমেরিকান সাংবাদিকের কাছে ঐ মুহূর্তগুলি এক মহান মানুষকে ‘বেঁচে থাকার চূড়ান্ত সূত্রগুলি নিয়ে প্রশ্ন করার এক অবকাশ।’
“ এক সময় নীরবতার অবকাশে আমি বিপ্লববাদী ও দর্শনবেত্তাকে নিয়তিমূলক প্রশ্ন করলাম, ‘বেঁচে থাকার মানে কি?’ তাঁর চিত্ত মুহূর্তের জন্য যেন উথল-পাথাল, সমুখে গর্জনশীল সমুদ্র ও অস্থির তটের দিকে তাকালেন। আবার শুধালাম, ‘বেঁচে থাকার মানে কি?’ গভীর ও মন্দ্র কন্ঠে জবাব দিলেন,’সংগ্রাম।’৮  
প্রথমে সুইন্টন ভাবলেন , ‘হতাশার প্রতিধ্বনি’ কিন্তু আসলে তিনি ‘জীবনের নিয়ম’ বুঝিয়েছিলেন,যার অন্বেষণে ছিলেন, তিনি ও তাঁর মত অনেকে।৯           
২। মেইটল্যান্ড পার্ক রোডের ঘর
সুইন্টনের সাক্ষাৎকারের কয়েক মাস পরে ১৮৮১ সালের জানুয়ারী মাসে একদিন রাতে উত্তর লন্ডনে তাঁর ঘরে  শুভ্রপ্রায় শ্মশ্রু এক ব্যক্তি বইয়ের স্তুপ সামনে রেখে সযত্নে একের পর এক অতি গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদ লিখে চলেছিলেন।কর্মরতের মত অধ্যবসায় নিয়ে তিনি শ্রমিক আন্দোলনকে ঔপপত্তিক ভিত্তিতে পুঁজিতান্ত্রিক উৎপাদন পদ্ধতি ধ্বংসের জন্য রসদ যুগিয়ে তাঁর জীবনের লক্ষ্য পূরণে নিয়োজিত ছিলেন।        
প্রতিদিন অধ্যয়ন ও লিখনের কঠোর পরিশ্রমের ছাপ পড়েছিল তাঁর শরীরে। পিঠ ও শরীরের অন্যত্র ফোঁড়ায় ভর্তি ছিল,যখন তিনি ‘পুঁজি’ গ্রন্থ প্রণয়ন নিয়ে কাজ করছিলেন। তাঁর প্রয়াস জীবন জুড়ে বহু ক্লেশ ও প্রতি বন্ধকে কন্টকিত ছিল, যা থেকে দু দন্ড শান্তি পেতেন যখন শাসক শ্রেনীর হর্তা-কর্তা ও তাঁর শিবিরভুক্ত রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের তাঁর কর্মকান্ড আঘাত হানত।        
শীতকালে তিনি প্রায়ই ক্লান্ত ও দুর্বল হয়ে পড়তেন, কারণ তখন বার্ধক্যের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে যা তাঁর কর্মশক্তি সীমিত করছিল এবং তাঁর শরীর নিয়ে তাঁর স্ত্রীর উদ্বেগ বাড়ছিল। কিন্তু এসব সত্বেও তিনি তো কার্ল মার্ক্স, যিনি আগের মতই তীব্র আবেগ নিয়ে শ্রমিক শ্রেণীর মুক্তির লক্ষ্যে পরিশ্রম করে চলেছেন, যেমনটি করতেন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের প্রথম পর্বে, প্রবল পরিশ্রমী ও সমালোচনাত্মক।
একটি কাঠের আরাম কেদারায় উপবিষ্ট মার্ক্স সারা দিনরাত সামনে রাখা একটি তিন ফুট চওড়া – দু ফুট লম্বা ডেস্কে হাত দিয়ে টোকা মেরে চলেছেন।১০ সেটা  এমন বড়ো ছিল না যাতে একটা সবুজ বাতিচ্ছায়া, লেখার কাগজগুলি ও প্রয়োজনীয় বইগুলি  রাখা যায়। তার চাহিদা ঐগুলিই।
দোতলায় পড়ার ঘরের অলিন্দ থেকে বাগান দেখা যায়। ডাক্তার ধূমপান নিষিদ্ধ করার পরে তামাকের গন্ধ উধাও হলেও বহুদিনের অভ্যাসের স্বাক্ষর মাটির গড়গড়াটা থেকে গেছে, যা  রাজনৈতিক অর্থনীতির ধ্রুপদী গ্রন্থ পাঠে বহুনিশি জাগরণ স্মরিয়ে দেয়।    
দেয়ালগুলির তাকগুলিতে বই আর সংবাদপত্রে অভাবনীয়ভাবে ঠাসা, যেখানে একটি আঙুলও ঢোকানো যাবে না। সে সময়ে তার মাপের  বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবিদের মত তাঁর গ্রন্থাগার সুদৃশ্য ছিল না, যদিও সংগ্রহের দিক থেকে তিনি অনেক এগিয়ে ছিলেন। তাঁর সবচেয়ে দারিদ্র্যকালে তিনি ব্রিটিশ মিউজিয়মে পাঠ কক্ষ থেকে রসদ সংগ্রহ করেছিলেন। পরে প্রায় ২০০০ বই সংগ্রহ করতে পেরেছিলেন।১১  তার মধ্যে অর্থশাস্ত্র নিয়ে বইই সবচেয়ে বেশী, কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞান তত্ব, ইতিহাস সংক্রান্ত গ্রন্থাদি ( বিশেষত ফরাসী ভাষায় লেখা), জর্মন ঐতিহ্যবাহী দর্শন সংক্রান্ত বইপত্রও ছিল। তাছাড়া প্রকৃতি বিজ্ঞান সংক্রান্ত লেখাপত্র।
নানা ভাষা জানার দরুন নানা বিষয়ে তাঁর জানার পরিধি বিস্তৃত ছিল। বইগুলির এক-তৃতীয়াংশ জর্মন, সিকি ভাগ ইংরেজী ও তার চেয়ে একটু কম ফরাসী ভাষায়। ইতালীয়-র মতো রোমীয় ভাষায় লেখা গ্রন্থ-প্রবন্ধাদিও ছিল। কিন্ত জার সাম্রাজ্যের পরিবর্তন অবলোকনের জন্য ১৮৬৯ থেকে তিনি রূশ ভাষা শিখে রপ্ত হয়েছিলেন। সেই সব বই সিরিলিক হরফে লেখা।
সেই  তাকগুলি কেবল ভারী ভারী অকাদেমিয় বিষয়ক বইয়ে ভর্তি ছিল না। শিকাগো ট্রিব্যুন-এর এক অজ্ঞাত সাংবাদিক ১৮৭৮ সালে তাঁর পড়ার ঘর দেখে এসে লিখেছিলেমঃ“একজন মানুষকে চেনা যায় তিনি কি ধরণের বইটই পড়েন। মোটামুটি ধারণা করতে পারবেন তাঁর সম্পর্কে যাঁর বইয়ের তাকগুলিতে আছে শেক্সপিয়র, ডিকেন্স, থ্যাকারে, মোলেয়ার,রাসিন,  মনতের্ন, বেকন, গ্যয়টে, ভলত্যের, পেইন, ইংরেজী , আমারিকান, ফরাসী নীল নথিখাতা, ; রাজনীতি, দর্শন ইত্যাদি নিয়ে রুশ, জর্মন, স্প্যানিশ, ইতালীয় প্রভৃতি ভাষায় রচিত বই।১২”  
মার্ক্সের সাহিত্যে বিলাস নিয়ে পল লাফার্গও অনুরূপ বর্ণনা দিয়েছেন। তাঁর পাঠ কক্ষ নিয়ে স্মৃতিচারণে, লিখেছেনঃ ‘মার্ক্সের অপার্থিব জীবনের ভিতরে প্রবেশ করতে গেলে জানতে হবে সেই ঐতিহাসিক পাঠ কক্ষের কথা”

“ হাইনে ও গ্যয়টে তাঁর কন্ঠস্থ ছিল  এবং কথোপকথনে প্রায়শ উদ্ধৃত করতেন, প্রায় সব ইয়োরোপীয় কবির তিনি নিবিস্ট পাঠক ছিলেন। প্রতি বছর মূল গ্রীক ভাষায় ইস্কাইলাস পড়তেন। তারঁ মতে ইনি ও শেক্সপিয়র মানবেতিহাস জন্মানো সবচেয়ে বড় দুই নাট্য প্রতিভা। দান্তে ও রবার্ট বার্ন্স তাঁর দুই প্রিয় কবি ছিলেন।বড়  উপন্যাস পাঠকও ছিলেন। অষ্টাদশ শতকে তাঁর বিশেষ প্রিয় উপন্যাস  ফিল্ডিং-এর টম জোন্স। তার পরের যুগে যে সব ঔপন্যাসিক তাঁর কৌতূহল জাগিয়েছিল, তাঁদের মধ্যে ছিলেন পল দ্য কোখ, চার্লস লিভার, আলেকজান্ডার ডুমা (বড়) ও ওয়াল্টার স্কট, যাঁর ‘ওল্ড মরালিটি’কে তিনি মহৎ শিল্প কর্ম মনে করতেন। তিনি দুঃসাহসিক অভিযান ও হাস্যরসাত্মক গল্প বেশি পছন্দ করতেন। ঔপন্যাসিকদের মধ্যে সবচেয়ে উপরে স্থান দিয়েছিলেন সারভ্যান্টিস ও বালজাককে। ডন কিহোতের মধ্যে তিনি দেখেছিলেন মুমূর্ষু শৌর্যের মহাকাব্য যার গুণাবলী উদীয়মান বুর্জোয়াদের জগৎ বিদ্রূপ ও উপহাস করত।বালজাকের লেখা তিনি এতই পছন্দ করতেন যে তিনি তাঁর অর্থশাস্ত্র নিয়ে বই লেখা সম্পূর্ণ হলে তাঁর লা কমেদি হিউমেন-এর সমালোচনা লিখতে চেয়েছিলেন। মার্ক্স সব ইয়োরোপীয় ভাষা জানতেন। তিনি প্রায়ই বলতেন,’ জীবন সংগ্রামে একটি বিদেশী ভাষা এক আয়ুধ।’ তাই রুশ ভাষা শেখা শুরু করলেন(এবং) ছ’মাসের মধ্যেই রুশ কবি ও গদ্য লেখকদের লেখা গড়গড় করে পড়তে পারতেন।তাঁর পছন্দের সাহিত্যিক হয়ে উঠলেন পুশকিন, গোগোল ও শ্চেদ্রিন।১৩
বইয়ের সঙ্গে মার্ক্সের সম্পর্ক নিয়ে লাফার্গ বলেছেন যে সেগুলো তাঁর কাছে ছিল মনোগত যন্ত্র, বিলাস সামগ্রী নয়, বলতেন ‘এরা আমার দাসানুগ, আমার ইচ্ছামত আমাকে সেবা করবে’। ক্কচিত-কখনো  পৃষ্ঠা গুলির কোনায় মার্জিন্র গোটা লাইন দাগিয়ে রাখতেন, বইয়ের ওপরে দাগ দিতেন না।, লেখকের লেখায় অত্যুক্তি মনে হলে বিস্ময় চিহ্ন দিতেন। এভাবে দাগ দিলে প্রয়োজনীয় অনুচ্ছেদ ১৪ খুঁজতে সুবিধা হত ।
সেগুলিকে মার্ক্স গুরুত্ব দিতেন বলেই নিজেই সংজ্ঞায়িত করেছিলেন ‘যন্ত্র হিশেবে, যা পূর্ণভাবে সদ্ব্যবহৃত হলে ইতিহাসের  আস্তাকুড়ে ফেলে দেওয়া যাবে।১৫      
সেগুলিকে মার্ক্স গুরুত্ব দিতেন বলেই নিজেই সংজ্ঞায়িত করেছিলেন ‘যন্ত্র হিশেবে, যা পূর্ণভাবে সদ্ব্যবহৃত হলে ফেলে দেওয়া হবে, কিন্তু ইতিহাসের চড়াই সড়কে আরেক রূপ নেবে।১৫  
মার্ক্সের সংগ্রহশালায় তাঁর নিজের রচনাবলীও ছিল, কিন্তু সংখ্যায় খুব কম। কারণ তাঁর গভীর বুদ্ধিগত চর্চার জন্য যে লেখাগুলি প্রণয়নে সংকল্পবদ্ধ ছিলেন, তার বেশির ভাগ অসম্পূর্ণ রয়ে গিয়েছিল। সেখানে ‘পূত পরিবার (১৮৪৫), ও ‘দারিদ্র্যের দর্শন (১৮৪৭) এর কয়েকটি কপি ছিল। অবশ্য এঙ্গেলস-এর সঙ্গে যৌথভাবে প্রণীত ‘কমিউনিস্ট ইস্তাহার(১৮৪৮)এর কপির অভাব ছিল না, যা সময়োচিতভাবে ১৮৪৮ সালে বিপ্লবের সময়ে প্রকাশিত হয়েছিল।যেমন ফরাসী ইতিহাস নিয়ে লেখা ‘লুই বোনাপার্টের অষ্টাদশ ব্রুমেয়ার (১৮৫২)’-এর পাশাপাশি রক্ষিত ছিল লর্ড পামারস্টোনের জীবনকথা ((১৮৫৩-৫৪)-র মত তার্কিক গ্রন্থ ও সমসাময়িক বিষয় নিয়ে  ‘কোলন-এর কমিউনিস্টদের বিচার (১৮৫৩) বা ‘অষ্টাদশ শতাব্দীর গোপন কূটনৈতিক ইতিহাস’ (১৮৫৬-৫৭) আর তখনও কম পরিচিত ‘ রাজনৈতিক অর্থনীতির সমালোচনা সম্পর্কে এক আলোচনা (১৮৫৯) ও ‘হের হ্বোগত ( ১৮৬০) এর মত উদ্ভাসিত  রচনাবলী ।  
তাঁর রচনাবলীর মধ্যে তাঁর গর্ববোধ ছিল ‘পুঁজি’ নিয়ে ( যা সেই সময়ে রুশ ও জর্মনে অনুদিত হয়ে গেছে) এবং আন্তর্জাতিক শ্রমজীবি সঙ্ঘের গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবগুলি ও প্রধান প্রধান কেন্দ্রগুলির ঠিকানা ও তথ্যাদি।
কোথাও রক্ষিত ছিল তাঁর যৌবনকালে সম্পাদিত পত্রিকাগুলির কপি – ডয়েশ ফ্রানৎসোসিখ জাহরবুখের, দৈনিক নয়ে রাইনিশ ৎসাইটুং (যার অন্তিম সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল মে ১৮৪৯এ, প্রতিবিপ্লবের বিজয়ের প্রাক্কালে , লাল কালিতে ছাপা ), মাসিক নয়ে রাইনিশ ৎসাইটুং-এর অনেক কপি।পরের বছর  পোলিটিশ ওকোনমিশ রেভ্যু নামে প্রকাশ শুরু হয়েছিল। সংগ্রহশালার অন্য অংশে ছিল ডজন ডজন উদ্ধৃতিপূর্ণ খাতাপত্র ও অসম্পুর্ণ রচনাদির খসড়া, যদিও সেগুলোর অধিকাংশের ঠাঁই হয়েছিল  ঘরের লফটে,যেখানে ছিল তাঁর জীবনের বিভিন্ন পর্বে যেসব লেখার প্রকল্পযা  শুরু করেও শেষ করে যেতে পারেন নি।১৬  তার মধ্যে ছিল বহু ছড়ানো-ছিটানো খাতাপত্র ও ফলিয়োর পাহাড়   যার কিছু কিছু  ‘পরিত্যক্ত হয়েছিলমূশিক কুলের দন্তজ তিক্ত সমালোচনায়’।১৭
এগুলির মধ্যে ছিল ‘১৮৪৪ সালের অর্থনৈতিক ও দার্শনিক (১৮৪৪) ও জর্মন মতাদর্শ (১৮৪৫), বিংশ শতাব্দীতে সর্বাধিক পঠিত ও আলোচিত দুটি গ্রন্থ।
এসব জানলে মার্ক্স বিস্মিত হতেন, কেন না তিনি কোনো লেখাই বারবার সংশোধন ছাড়া ছাপতে দিতেন না, যতক্ষণ না তাঁর মতে যথার্থতম হচ্ছে এবং ‘যিনি  লেখা অসম্পূর্ণ রাখার চেয়ে পুড়িয়ে ফেলা শ্রেয় মনে করতেন,১৮ যাতে নেতিবাচক বার্তা না যায়।
তাঁর বৃহত্তম ও প্রধানতম পান্ডুলিপিগুলির মধ্যে পড়ে ‘পুঁজি’ প্রাথমিক খসড়াগুলি অর্থাৎ গ্রুন্দ্রিসি (১৮৫৭-৫৮) থেকে শুরু করে ১৮৮১ সালে চূড়ান্ত খসড়া।  মার্ক্স ও এঙ্গেলসের পত্রাবলীকে বলা হ’ত ‘পার্টির মহাফেজখানা’, কিন্ত সেগুলি সুরক্ষিত ছিল এঙ্গেলস-এর বাড়িতে।     

বইপত্রে-ঠাসা মার্ক্সের পাঠকক্ষে একটা চামড়ার সোফা ছিল, যেখানে তিনি মাঝে মাঝে বিশ্রাম নিতে শুয়ে থাকতেন। মানসিকভাবে নিজেকে হাল্কা করার জন্য ঘরের মধ্যে পায়চারি করা তাঁর নিয়মিত অভ্যাস ছিল।লাফার্গের ভাষায়, ‘ বলা যায় ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে করতেও কাজ করতেন আর হাঁটতে হাঁটতে যা ভাবতেন অল্পক্ষ্ণণের বসতেন তা লিখতে’। মার্ক্স ‘ এগিয়ে-পিছিয়ে পায়চারি করতে ভালোবাসতেন, মাঝে মাঝে থমকে দাঁড়াতেন যখন ব্যাখ্যান জীবন্ত হয়ে উঠত বা বাচন গভীরতা পেত’। সেই সময় আরেকজন নিয়মিত যেতেন এমন একজন বলেছেন ‘ তাঁর অভ্যাস ছিল ঘরে এদিক থেকে ওদিক পায়চারি করার সময় আলোচনা করতে অনেকটা নাবিকের  মালপত্র রাখাত মত।১৯
ডেস্কের সামনে ছিল একটি টেবিল।ক্কচিত আসতেন এমন কেউ এসে তার ওপরে ডাঁই-করা কাগজ দেখলে হতবম্ব হতেন। কিন্তু মার্ক্সকে যাঁরা চিনতেন, তাঁরা অবগত ছিলেন যে ঐ অবিন্যস্ততা বাহ্যিক।সব কিছু ঠিক জায়গাতেই আছে এমনভাবে যে কোন বই বা লেখাজোখা খাতা যখন সরকার তক্ষুনি পেতেন। কথা বলতে বলতে তিনি প্রায়শ যতি নিয়ে দেখাতেন তাঁর উল্লেখিত কোন উদ্ধৃতি বা পরিসংখ্যান কোন বইটায় আছে। তিনি ও তাঁর পাঠকক্ষ অভিন্ন ছিল । বইপত্র তাঁর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মত ছিল।২০ আসবাবগুলির শেষে          ছিল একটি ড্রয়ার-সারি।তাতে ছিল তাঁর প্রিয় কমরেডদের ছবি যেমন হ্বিলহেল্ম ওলফ, যাঁকে তিনি ‘পুঁজি’ উৎসর্গ করেছিলেন। তাঁর পাঠকক্ষে অনেকদিন রাখা ছিল জোভ-এর আবক্ষ মূর্তি গটফ্রিড লিবনিৎস-এর (১৭১৭-১৭৮৩) বাড়ির দেয়ালের দুটি খন্ড,যেগুলি  তাঁকে যথাক্রমে  ১৮৬৭ সালে ক্রিসমাসে ও ১৮৭০ সালে ৫২তম জন্মদিনে উপহার দিয়েছিলেন তাঁর বহুদিনের প্রিয় বন্ধু ও তাঁর চিকিৎসক লুদ্বিগ কুগেলম্যান।সেই সময় অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথিতযশা জর্মন দার্শনিকের হ্যানোভার-এর বাড়িটা ভেঙ্গে ফেলা হয়েছিল ।
মার্ক্স ও তাঁর পরিবারের বাস ছিল উত্তর লন্ডনের ৪১ মেইটল্যান্ড পার্ক রোডের এক লতাগুল্মঘেরা বাড়ি। সেখানে তাঁরা বাস শুরু করেন ১৮৭৫ সালে। তার আগে এক দশক কাটিয়েছেন ঐ  রাস্তার ১ নং ভাড়া-নেওয়া বাড়িতে, যার ভাড়া ও জায়গা বেশী ছিল।২১ সেই সময় ছোট পরিবারের সদস্য তিনি, তাঁর স্ত্রী ইয়েনি, কনিষ্ঠা কন্যা ও প্রায় চার দশক-জুড়ে থাকা গৃহশিক্ষিকা হেলেন দেমুথ। মার্ক্সের প্রিয় তিনটি কুকুরও ছিল – টডি, হুইস্কি ও অনামা, যেগুলি কোন জাতের তা জানা ছিল না, কিন্তু পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য।২২
এঙ্গেলস ১৮৭০ সালে ব্যবসা থেকে অবসর নিয়ে ম্যাঞ্চেস্টারের বাড়ি ছেড়ে সেই কমরেডের বাড়ি  থেকে  কিলোমিটারের মধ্যে ১২২ রিজেন্ট পার্ক রোডে বাসা নিলেন যাঁর সাথে ১৮৪৪ সাল থেকে একসাথে রাজনৈতিক সংগ্রাম করেছেন ও গভীরতম বন্ধুত্বে আবদ্ধ।২৩
মার্ক্সের নানাবিধ অসুখের কারণে ‘অনেক বছর ধরেই তাঁর চিকিৎসা-পরামর্শদাতারা ২৪ সারা রাত জেগে কাজ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছিলেন , কিন্তু ‘পুঁজি’র পান্ডুলিপি লেখা শেষ করার জন্যে সারাদিন অবিশ্রান্ত গবেষণা করেছিলেন- ১৯৬৭ সালে তার প্রথম খন্ড প্রকাশের পরে দ্বিতীয় খন্ডের প্রস্তুতি চলছিল      
সেই সময়ের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচার করে তা শ্রমিক শ্রেণীর মুক্তি সাধনে নতুন  চিত্রপট রচনা করতে পারে কি না তার পূর্বাভাসের চেস্টস করতেন। পরিণামে তাঁর অতৃপ্ত কৌতূহল ও সর্বজ্ঞ মানসের বলে তিনি তাঁর প্রজ্ঞা সমৃদ্ধ হত এবং সাম্প্রতিকতম বৈজ্ঞানিক বিকাশ সম্পর্কে অবহিত হতেন। এ কারণেই জীবনের শেষ বছরগুলিতে, মার্ক্স ডজন ডজন গণিত, শারীরবিদ্যা, ভূ-তত্ব, খনিজবিদ্যা, কৃষিকলাবিদ্যা, রসায়ন ও পদার্থবিদ্যা নিয়ে উদ্ধৃতি ও টিকামন্তব্যপূর্ণ খাতাপত্র লিপিবদ্ধ করেছিলেন ; তার সাথে সংসদীয় নথিপত্র,পরিসংখ্যান, সরকারী রিপোর্ট যেমন তাঁর নীল পুস্তিকাগুলি ছিল।         
বিভিন্ন ভাষায় ঐ বিষয়গুলি অধ্যয়নে যতি খুব কম ঘটত। সখেদে এঙ্গেলস বলেছেন, ‘অনেক কস্টে তাকে পাঠকক্ষ থেকে তিনি  বের করে আনতে পারতেন’২৫ । ব্যতিক্রম না হলে  স্বাভাবিক বিরতি ও কারো সঙ্গে  সাক্ষাৎ প্রয়োজন ছাড়া কাজ ছেড়ে   বের করা যেতো না।  
অপরাহ্নের শেষ দিকে তিনি শরীর ও মাথা ওভারকোটে ঢেকে অদূরে মেইটল্যান্ড পার্কে যেতেন ও তাঁর জ্যেষ্ঠ্য পৌত্র জনি-কে সাথে নিয়ে হাঁটতে ভালোবাসতেন, রোববার সপরিবারে আরেকটু এগিয়ে হ্যাম্পস্টিড হিথ-এ যেতেন। তাঁর কনিষ্ঠা তনয়ার বন্ধু অভিনেত্রী ম্যারিয়ান কম্যিন তাঁর দেখা দৃশ্য সুচারু ভাষায় লিখেছেনঃ “ অনেক সময় এলিয়ানর ও আমি গোধূলির সময় বৈঠক খানার আগুন-পোহানো স্থানের সামনে কম্বলের ওপর বসে আস্তে সদর দরজা বন্ধ হবার আওয়াজ পেতাম , তার পরেই কালো কোট ও মাথায় নরম টুপি পরিহিত  ডক্টরকে  জানলা দিয়ে যেতে দেখতাম, অন্ধকার নামার আগে ফিরতেন না।”২৬

কাজ থেকে বির‍্তি নিতেন তথাকথিত ডগবেরি ক্লাবের সভার সময়।২৭ ক্লাবের নাম উইলিয়ম শেক্সপিয়ারের (১৫৬৪-১৬১৬) ‘মাচ অ্যাডো অ্যাবাউট নাথিং’ নাটকের এক চরিত্র থেকে নেওয়া। সভায় মহাকবির লেখা থেকে পাঠ হ’ত এবং এঙ্গেলস তাঁর ঘনিষ্ট বন্ধু মার্ক্সের মেয়েদের নৈশ আহারে আমন্ত্রণ করতেন।২৮ সেই সান্ধ্য বাসরগুলি মার্ক্স মাতিয়ে দিতেন বিদ্রূপ রসে পূর্ণ করে, যাতে কামড় ছিল যা তাঁর তত্বগত বিরোধীদের প্রতি বিদ্রূপের চেয়ে কিছু কম ছিল না। ‘ এটা অদ্ভূত যে কেউ সাহচর্য বিনা বাঁচতে পারে না, আবার সাহচর্য পেলে কখন তা থেকে রেহাই পাবে, তাই ভাবে।’২৯        
মার্ক্সের বাসায় অসুবিধে সত্বেও বিভিন্ন দেশ থেকে আগত অতিথিদের জন্য অবারিত ছিল। তাঁর মত উচ্চ মাপের অর্থশাস্ত্রবিদ ও প্রখ্যাত বিপ্লবীর সাথে মুখোমুখি আ লোচনার জন্য এঁরা আসতেন। যাঁরা ১৮৮১ এসেছিলেন, তাঁদের মধ্যে ছিলেন ক্রিমিয়া-র নিকোলাই জিবার (১৮৪৪-১৮৮১)। মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নিকোলাই কাব্লুকভ (১৮৪৯-১৯১৯),জর্মন সাংবাদিক ও উত্তরকালে রাইখস্ট্যাগ-এর সদস্য লুই ভিয়েরেক (১৮৫১-১৯২১), বহুদিনের সোশ্যাল ডেমক্র্যাট ফ্রিডরিক ফ্রিৎস (১৮২৫-১৯০৫) ও জর্মন জনমোহনী নেতা লিও হার্টম্যান(১৮৫০-১৯০৮)। মেইটল্যান্ড পার্ক রোডের বাসায় আর যারা প্রায়ই আসতেন , তাঁদের মধ্যে ছিলেন সোশ্যাল ডেমক্র্যাটিক পার্টির সঙ্গে যুক্ত সাংবাদিক কার্ল হার্শ (১৮৪১-১৯০৯), হেনরি হ্যিন্ডম্যান (১৮৪২-১৯২১), যিনি তার আগের বছর ইংল্যান্ডে ডেমক্র্যাটিক ফেডারেশ্যন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং প্রাগ থেকে আগত তরুণ সমাজতন্ত্রী কার্ল কাউৎস্কি(১৮৫৪-১৯৩৮), যিনি জ্ঞানচর্চার উদ্দেশ্যে মার্ক্স ও এঙ্গেলসের ঘনিষ্ঠ হতে লন্ডনে এসেছিলেন ও পরবর্তী কালে শ্রমিক আন্দোলনে প্রভাবশালী তত্ববিদ হয়ে উঠেছিলেন।        
যেই মার্ক্সের সাহচর্যে আসত, সেই ব্যক্তি মার্ক্সের ঘনিষ্ঠ হবার আকর্ষণ রুখতে পারত না বা তাঁর দর্শনে মুগ্ধ না হয়ে থাকতে পারত না। স্কটল্যান্ডের রাজনীতিবিদ মাউন্টস্টুয়ার্ট এলফিনস্টোন (১৮২৯-১৯০৬) ১৮৭৯ সালের গোড়ায় তাঁকে দেখার বর্ণনা করেছেন, “তাঁর অভিব্যক্তি কঠোর হলেও মনোরম ছিল। মনেই হত না যে তাঁর সম্পর্কে পুলিশ এমন ধারনা গড়েছিল যেন তিনি দোলাউ শায়িত শিশুদের ভক্ষণ করতেন।” ৩০
এডোয়ার্ড বার্ন্সটাইনও মার্ক্সের মানবিকতা ও নম্রতায় মুগ্ধ হয়েছিলেনঃ “ আমি ভেবেছিলাম এক চাপা স্বভাবের ও খুব উত্তেজক এক বৃদ্ধ মানুষ হবেন, এখন দেখছি এত অতি শুভ্রকেশ ও হাস্যময় কৃষ্ণাক্ষি মানুষ, যার ভাশণ কারুণ্যে পূর্ণ।”৩১  
কাউটস্কির স্মৃতিতে ‘মার্ক্সকে দেখলে মনে হ’ত কোনো সম্ভ্রান্ত গোষ্ঠীপতি‘৩২ যাঁর ‘মৃদু হাসিতে ছিল অপত্য স্নেহাভাষ’৩৩ এবং সদা ফিটফাট পোষাক-পরিহিত এঙ্গেলস-এর বিপরীত’ ও ‘বাহ্যিক প্রকাশে অনীহ’।৩৪
ম্যারিয়ান কোম্যিন তাঁর মেজাজী স্বভাব বর্ণনা করেছেনঃ “ তিনি ছিলেন এক অসাধারণ রকমের বলিষ্ঠ ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। মাথাটা বিরাট, দীর্ঘ ও পক্ককেশ-এর সাথে রোমশ শ্মশ্রু ও গোঁফ, ছোট ,  কালো অথচ অবলোকনরত তল্লাশী চোখ, মাঝে মাঝে বিদ্রূপাত্মক ফূট-কাটা। শ্রোতা হিশেবে ছিলেন চিত্তাকর্ষক, কখনো  নিন্দাবাদ ন’ন, কৌতুক-উপভোগী, কৌতুককর হলে হেসে গড়িয়ে পড়তেন, যতক্ষণ না হাল বেয়ে অশ্রূনির্গত না হ’ত। বয়সে সবার বড়ো কিন্তু মানসিকতায় আমাদের মত তরুণ।৩৫            
মার্ক্সের গৃহকোণ প্রায়ই গুঞ্জরিত হ’ত  চিঠির বাক্স সব সময় উপচে পড়ত সক্রিয় কর্মী ও পৃ সপ্তাহে বিদেশ থেকে বুদ্ধিজীবিদের পাঠানো চিঠিতে। তাঁরা সেই সময়কার প্রধান প্রধান রাজনৈতিক ঘটনাবলী সম্পর্কে আন্তর্জাতিক শ্রমজীবি সঙ্ঘের নেতার সাথে আলোচনা করতে এবং করণীয় কি ও কি সিদ্ধান্ত বা কর্মসূচি নেওয়া উচিৎ , সে সম্পর্কে পরামর্শ চাইতেন।
ব্রিটেনের পীত ও বাদল আবহাওয়া-আবৃত ছিল মার্ক্সের দিনযাপনের পরিপার্শ্ব। রামসগেট থেকে ফেরার পরে ধীরে ধীরে স্বাস্থোন্নতি হলেও নিকোলাই ড্যানিয়েলসনকে (১৮৪৪-১৯১৮) ১৮৮০-র ফেব্রুয়ারীতে লিখলেন, মাসের পর মাস বিরক্তিকর আবহাওয়ার  লাগাতর কাশি ও ঠান্ডা-লাগা তাঁর ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে।৩৬আশঙ্কাজনকভাবে ইয়েনি-ও শীতে কাহিল। বসন্ত আসতেই মার্ক্স এক নতুন বিশেষজ্ঞ ব্রায়ান ডনকিন (১৮৪২-১৯১৭)কে দেখালেন তাঁর স্ত্রীর নিরাময়ের আশায়।
তাঁর রুশ বন্ধুটিকে আরেকটি হতাশব্যঞ্জক খবর জানালেন।যে শত শত বিপ্লবী  ১৮৭১-এর প্যারী কমিউনের পর নিপীড়ন এড়াতে দেশছাড়া হয়েছিলেন,  ১৮৮০ সালে  ফরাসী সরকার তাদের রাজক্ষমা ঘোষণা করেছে। এ খবর তাঁকে ব্যথিত করার সাথে সাথে বড় মেয়ে ইয়েনির দশ বছরের স্বামী সাংবাদিক ও কমিউনার্ড শার্ল লোঁগে জর্জ ক্লেমেনশো(১৮৪১-১৯২৯)-প্রতিষ্ঠিত আমূল পরিবর্তনপন্থী দৈনিক ‘লা জাস্তিস’-এ যুগ্ম সম্পাদকের চাকরি পেয়ে তাঁদের সন্তানাদি সহ ফ্রান্সের রাজধানীতে ফিরে যান।মার্ক্স ও তাঁর স্ত্রী বিষণ্ণ হয়ে পড়েছিলেন কারণ তাঁদের তিন সন্তান তথা নাতি-নাতনিরা মার্ক্স দম্পতি অনিঃশেষ আনন্দের উৎস ছিল।৩৭
পরের কয়েকমাস ওদের অনুপস্থিতি তাঁদের সবসময় অনুভব করতেন। মার্ক্স আনন্দ=বিষাদের দোলাচলে ছিলেন। মেয়েকে চিঠি লিখে  সবসময় বাচ্চাদের খবর জানতে চাইতেন।
“তোমরা চলে যাবার পর থেকেই জনি, হারা, তোমরা ও চা মহাশয় বিনা দিনযাপন একঘেঁয়ে.৩৮ মাঝে মাঝে জানলায় শিশুদের কন্ঠ শুনলে তাৎক্ষণিক মনে হয় ঐ চার জনের আওয়াজ, ভুলে যাই এরা এখন চ্যানেলের (ইংলিশ – অনুবাদক) অন্য পাড়ে।”৩৯  
এপ্রিলের শেষে ইয়েনি আরেক শিশুর জন্ম দিল – মার্ক্সের চতুর্থ দৌহিত্রী। মার্ক্স স কৌতুকে অভিনন্দিত লিখলেন ‘নারী জাতি’ প্রত্যাশা করে যে ‘নবজাতক’ জনসমষ্টিতে ‘স্ত্রী’বৃদ্ধি’ করুক। আরো বললেনঃ “ আমার দিক থেকে ইতিহাসের বর্তমান সন্ধিক্ষণে কাম্য বলিষ্ঠ। তাদের পেরোতে হবে মানবেতিহাসের অপেক্ষমাণ  সবচেয়ে বৈপ্লবিক সময়।”৪০       
রাজনৈতিক আশাবাহী এই ভাবনাগুলি তাঁর প্রজন্মের মানুষদের আগাম ধারণার সাথে মিশে গিয়েছিল। এর ফলে দুটি চিন্তা মাথায় এলো। প্রথমটি তাঁর একান্তই ব্যক্তিগত- প্যারিস-বাসিন্দা মেয়ের কস্টকর দিনযাপনে তাঁর পাশে দাঁড়াতে না পারার মনঃকস্ট, যা তাঁর বহুদিনব্যাপী ক্লিষ্ট জীবনের কথা মনে করায়। মেয়েকে লিখলেন, তাদের সব ভালো কাজে মার্ক্স তাঁর স্ত্রীর শূভ কামনা জানালেন, কিন্তু ভাবলেন না যে ঐ শুভেচ্ছা নিরর্থ, একজন নিঃশক্তি জনের পাশ কাটিয়ে চলা। দ্বিতীয় চিন্তা তাঁর রাজনৈতিক অবসাদ , তাঁর মনে হচ্ছিল যে আন্ত র্জাতিক শ্রমিক আন্দোলনের উৎসাহব্যঞ্জক সংগ্রামগুলি তিনি দেখে যেতে পারবেন না। ৪১
দুর্ভাগ্যজনক, সেই সময় সব সমস্যাগুলিই আরো খারাপ হতে শুরু করল। জুনের প্রথম দিকে মার্ক্স সুইন্টনকে জানালেন তাঁর স্ত্রীর অসুখ ক্রমশ অন্তিমমুখী।৪২ তাঁর নিজের শরীরও নতুন উপসর্গে ভঙ্গুর, পায়ে বাতের ব্যথা বাড়ার জন্য টার্কিশ বাথ নিতে হচ্ছিল।৪৩ তাঁর যে বিরক্তিকর ও অবিশ্রান্ত কাশির ধাত ছিল, তখন বোধ হচ্ছিল, তার ‘দ্রুত অব্সান ঘটছে। জ্যেষ্ঠা কন্যা ও তাঁর ছেলেমেয়েদের অনুপস্থিতিও পীড়িত করছিল।‘ তোমার ও  ছেলেমেয়েদের কথা না ভেবে একটা দিনও কাটেনা’, মেয়েকে লিখেছিলেন। জনি-র জন্য  য়োইহান হ্বোলফগাং ফন গ্যইয়টের (১৭৪৯-১৮৩২)এক কপি ‘রেনার্ড দি ফক্স’ পাঠিয়ে খোঁজ নিলেন ‘বেচারা’কে ‘কেউ  সেটা পড়িয়ে শোনাতে পারছে কিনা।’ ৪৪
এই সব সমস্যার মধ্যে দিয়ে ১৮৮১র প্রথমার্ধ কাটল। দ্বিতীয়ার্ধ আরো সমস্যাকীর্ন।
৩।নৃবিদ্যা ও গণিতের মাঝে
তবু যে কোনো পরিস্থিতিতে মার্ক্স তাঁর কাজ চালিয়ে যেতেন। তখনও গবেষণা কর্ম যে শুধু চালিয়ে যেতেন তাই নয়, নূতনতর বিষয়ে প্রবেশ করতেন, তাঁর কিছু কিছু জীবনীকারের দাবি যে তাঁর জীবনের শেষ দিকে বৌদ্ধিক অনুসন্ধিৎসা ও ঔপপত্তিক ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছিল, এ ধারণা ভিত্তিহীন।৪৫

ফেব্রুয়ারী মাসে ড্যানিয়েলসন লিখলেন, ‘চিঠিপত্রের জবাব না দিতে পারার গ্লানি আমাকে লজ্জা দিচ্ছে’। কারণ নতুন পাঠ চর্চা ও  ‘নানা দেশ থেকে (বিশেষত মার্কিন মুলুক) আমাকে  পাঠানো গ্রন্থ রাশি পড়ে ফেলার প্রয়াসে নিমজ্জিত থাকা’।৪৬
ডিসেম্বর ১৮৮০ থেকে জুন ১৮৮১ কালপর্যায়ে  মার্ক্সের গবেষণা কেন্দ্রীভূত ছিল নৃবিদ্যায়। শুরু করলেন আমেরিকান নৃতত্ববিদ লুইস মর্গ্যান(১৮১৮-১৮৮১)-এর প্রাচীন সমাজ  দিয়ে, যা রুশ নৃকুলতাত্বিক ম্যাক্সিম কোভালেভস্কি (১৮৫১-১৯১৬) উত্তর আমেরিকা সফরের সময় নিয়ে আসেন ও ছাপানোর পরে মেক্সিকোয় পাঠান।
উৎপাদন ও কৃৎকৌশলকে সমাজ প্রগতির পূর্ব শর্ত হিশেবে মর্গ্যানের পদ্ধতি মার্ক্সকে চমৎকৃত করেছিল এবং তাঁকে ১০০ পৃষ্ঠায় ঠাসা-সংকলনে উদ্বুদ্ধ করেছিল।এর সিংহভাগ নিয়েই মার্ক্সের নৃকুলতত্বগত নোটবইগুলি। সেখানে অন্যান্য বইয়েরও উদ্ধৃতি ছিল- আইনজীবি ও ইন্দোনেশিয়া  বিশেষজ্ঞ জেমস মানি-র ‘জাভা অর হাউ টু ম্যানেজ আ কলোনি (১৮৬১), সিংহলের সুপ্রিম কোর্টের সভাপতি জন ফিয়ার(১৮২৪-১৯০৫)এর ‘এরিয়ান ভিলেজ ইন ইন্ডিয়া অ্যান্ড সিলোন (১৮৮০) ও ইতিহাসবিদ হেনরি মেইন (১৮২২-১৮৮৮)-এর লেকচার্স অন দি আর্লি হিস্ট্রি অফ ইন্সটিট্যূশ্যন্স (১৮৭৫) – সাকুল্যে আরো একশ পৃষ্ঠার লেখাজোখা।৪৭ এই লেখকদের সম্পর্কে  মার্ক্সের তুলনামূলক মূল্যায়ন পড়লে প্রতীয়মান হয় মার্ক্স অত অল্প সময়ে সব কিছু সংকলন করে বিষয়টির ভিতরে ঢুকতে পেরেছিলেন।
এর আগে গবেষণা পর্বে , ‘জর্মন মতাদর্শ’-র প্রথম পর্ব, ‘গ্রুন্দ্রিসি’-র দীর্ঘ অংশ ‘পুঁজিতান্ত্রিক উৎপাদনের প্রাক-আকারগুলি’ ও ‘পুঁজি-র প্রথম খন্ডে মার্ক্স অতীতের সমাজ –অর্থনৈতিক প্রকারগুলি সম্পর্কে নিরীক্ষা ও বিস্তৃত ব্যাখ্যা করেছিলেন। মূল রুশ ভাষায় ১৮৭৯ সালে কোভালেভস্কি-র ‘’এজমালি ভূমি সম্পর্ক(১৮৭৯) পড়ে তিনি ঐ বিষয়ে পুনর্চর্চা করার অবকাশ পেলেন। কিন্তু আরো গভীরে ঢুকলেন নৃকুলতত্বগত নোটবইগুলিতে যা তাঁর গবেষণা গভীরতর ও আধুনিকতর দিকে চালিত করেছিল।     
এই চর্চার উদ্দেশ্য ছিল ঐতিহাসিক কালপর্যায়গুলি, বিভিন্ন ভৌগোলিক এলাকা ও সংশ্লিস্ট বিষয়গুলি সম্পর্কে জ্ঞানের পরিধি প্রসার, যা রাজনৈতিক অর্থনীতির সমালোচনা-র প্রণয়নে সহায়ক হতে পারে। উপরন্তু, এই অনুসন্ধানের কাজ মার্ক্সকে সুদূর অতীতের সামাজিক বৈশিষ্ট্য গুলি প্রাতিষ্ঠানিকতা খতিয়ে দেখতে সাহায্য করেছিল। এসব তথ্য তিনি ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রখ্যাত পন্ডিতদের আধুনিকতর তত্বগুলি  ১৮৫০ ও ১৮৬০ দশকের পাণ্ডুলিপি রচনার সময় পান নি।
সেই নৃকুলতত্বগত অধ্যয়নে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছিল, যেসময় ‘পুঁজি’র দ্বিতীয় খন্ড লেখা সম্পূর্ণ করা তাঁর লক্ষ্য। এর জন্য শুধুমাত্র বোধিগত কৌতূহলই নয়, প্রয়োজন ছিল উচ্চমানের ঔপপত্তিক- রাজনৈতিক দিশা। মজবুত ঐতিহাসিক জ্ঞান এর ভিত্তিতে  বিভিন্ন উৎপাদনী পদ্ধতির সবচেয়ে সম্ভাব্য পরম্পরা তিনি পুনর্নির্মান করতে চেয়েছিলেন, যাতে সমাজের সাম্যবাদী রূপান্তরের  ধারনা-ভিত্তি রচিত হতে পারে।৪৮
তাই নৃকুলতত্বগত নোটবইগুলিতে মার্ক্স  পারিবারিক বন্ধনগুলি, নারীদের অবস্থা, সম্পত্তি সম্পর্কগুলি, প্রাক-পুঁজিতান্ত্রিক সমাজগুলিতে গোষ্ঠীগত রীতিসমূহ, রাষ্ট্র ক্ষমতার গঠন ও চরিত্র, ব্যক্তির ভূমিকা, এবং কোন কোন জাতপাতের নৃতাত্বিক বীক্ষণ ও উপনিবেশবাদের উপর তার প্রভাবের প্রাক-ইতিহাসের চমকপ্রদ নথিকরণ একত্রীভূত করেছিলেন। পারিবারিক বন্ধনগুলির বিকাশ ও প্রাক-ইতিহাস সম্পর্কে  মার্ক্স বেশ কিছু অমূল্য ইঙ্গিত পেয়েছিলেন মর্গ্যানের কাজে। হ্যিন্ডম্যান যেমন বলেছিলেন, ‘যখনলিউয়িস এইচ মর্গ্যানের ‘এনশ্যেন্ট সোসাইটি পাঠ করে মার্ক্স প্রত্যয়িত হলেন যে একক নয়, সমস্টিগত পরিবারই ৪৯ সাবেক আদিবাসী সমাজ ও প্রাচীন সমাজের  সামাজিক একক ছিল, মার্ক্স তৎক্ষণাৎ  তাঁর পূর্ব ধারণা  বর্জন করেছিলেন৫০ ।
আদিম জনসমস্টির সামাজিক কাঠামো সম্পর্ক নিয়ে মর্গ্যানের গবেষণা মার্ক্সকে গোষ্ঠীগত সাযুজ্য বিষয়ে সাবেকী ধারনার [ জর্মন ইতিহাসবিদ বার্থোল্ড নিয়েবুর(১৭৮৬-১৮৩১)-এর রোমের ইতিহাস (১৮১১-১২)গ্রন্থে ব্যাখ্যা দহ) সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্তি দিয়েছিল।৫০ তার আগেকার সব অনুমান-সূত্র খন্ডন করে মর্গ্যান বললেন  ‘একক বিবাহ’ ভিত্তির জন্যই অনেক পরিবার গড়ে উঠেছিল, এ অনুল্ক্রম বড়ই ভ্রান্ত।৫১ পিতৃতান্ত্রিক পরিবারকে সমাজের মৌলিক একক মনে করা অনুচিত, বরং  তখনকার বিবেচিত ভাবনার চেয়েও সাম্প্রতিক এক সামাজিক সাংগঠনিক রূপ,  প্রাক- ও প্রাচীন ইতিহাস সম্পর্কে  অধ্যয়ন করে তিনি এই মতে উপনীত হয়েছিলেন। সেই সংগঠন ‘এতই দুর্বল ছিল যে তা ‘এককভাবে জীবনের ক্লিস্টতা মোকাবিলা করতে পারত্ না।৫২  আমেরিকার মূলবাসীদের ‘পিতামাতাসন্তান’ নিয়ে পরিবার-একক-এর মত জীবনযাত্রায় অনুসৃত ‘সাম্যবাদ’এর সাথে সেই সামাজিক রূপ-এর সাদৃশ্য ছিল।৫৩
অন্যদিকে, মার্ক্স ক্রমাগত মেইন-এর বিরুদ্ধে বিতর্ক চালিয়ে গেছেন । মেইন তাঁর ‘প্রতিষ্ঠানগুলির পূর্বেকার ইতিহাস’ সংক্রান্ত বক্তৃতামালায় ‘ব্যক্তিকেন্দ্রিক পরিবার’কেই বলেছিলেন যার  ‘ভিত্তিতে উপগোষ্ঠী ও বংশ বিকশিত হয়েছিল’। ভিক্টোরীয় যুগকে প্রাক-ইতিহাসে আরোপ করে কালের তিরমুখ উলটে দেওয়ার চেস্টাকে মার্ক্স ঘৃণার চোখে দেখতেন, ভাবতে বাধ্য হয়েছিলেন যে “ইংরেজ অনুক্রম নয়,ঐ স্থূল-মস্তিষ্ক গোষ্ঠীপতি থেকেই সমাজপতির উৎপত্তি , এই অন্তঃসারশূন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।৫৪ এই উপহাস ধীরে ধীরে এমন উচ্চতায় পৌঁছেছিল যে ‘মেইন-এর মাথা থেকে ইংরেজ ব্যক্তিকেন্দ্রিক পরিবার ধারণা কখনো যায় নি’,৫৫ গোড়া থেকেই “রোমীয় ‘পিতৃশাসিত’ পরিবারের তত্ব আমদানী করেছিলেন”৫৬, মার্ক্স ফিয়ারকেও রেয়াৎ করেন নি, “ঐ গর্দভটার কাছেও সব কিছুই ব্যক্তিকেন্দ্রিক পরিবারগুলি ছিল।৫৭  
মর্গ্যান মার্ক্সকে আরও চিন্তার খোরাক যুগিয়েছিলেন , যেমন পরিবার (ফ্যামিলি)-এর ধারনা। ফ্যামিলি কথাটার উৎপত্তি ‘ফেমুলাস’ অর্থাৎ ভৃত্য থেকে, ‘যার সাথে বিবাহিত দম্পতি বা তাদের সন্তান-সন্ততিদের সম্পর্ক নেই,  আছে ক্রীতদাস ও ভৃত্যদের সাথেযারা পরিবারের কর্তার ক্ষমতাধীন থেকে নিজেদের ভরণপোষণের জন্য শ্রমদান করে।৫৮ এ সম্পর্কে মার্ক্স লিখেছেনঃ “আধুনিক পরিবারের জীবানু শুধু ক্রীতদাসত্ব নয়, ক্রীতদাস প্রথাও কারণ এর সূচনা কৃষিশ্রমে। ক্ষুদ্র পরিসরেও এর মধ্যে বৈরিতার সব কিছু আছে, যার  পরে সমাজে ও রাষ্ট্রে বিকশিত হয়েছে...। অন্যদের থেকে পৃথক থাকার জন্য  এক বিবাহ-ভিত্তিক পরিবারের পূর্ব শর্ত , গার্হস্থ্য শ্রেণী যা ক্রীতদাসেদের প্রত্যক্ষ গড়ন।”৫৯
সংক্ষেপে তাঁর নিজের ভাবনা নিয়ে মার্ক্স লিখেছিলেন, “ বাড়ি,জমি ও গো সম্পত্তি’ এক বিবাহ-ভিত্তিক পরিবারের অনুসঙ্গ।৬০ বস্তুত, কমিউনিস্ট ইস্তাহারে তাঁর অভিভাবনায় ব্যক্ত ছিল যে ‘শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস’ দিয়েই ইতিহাসের শুরু।৬১    
‘পরিবার, ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি’ (১৮৮৪) গ্রন্থের লেখক এঙ্গেলস বলেছিলেন তিনি  ‘বইটি লিখেছেন আদেশ বাহক হিশেবে, এক নামমাত্র পরিবর্তের বেশী নয়, যা তাঁর প্রাণসখা লিখে যেতে পারেন নি’।৬২ মার্ক্সের ‘নৃকুলবিদ্যা সংক্রান্ত নোটবুক’ এঙ্গেলস সম্পূর্ণ করেছিলেন। তিনি এক বিবাহ সম্পর্কে লিখেছিলেন, “ এক লিঙ্গের অন্য লিঙ্গের অধীনতা , দুই লিঙ্গের সংঘাত প্রাক-ইতিহাসে বলা হয়নি। মার্ক্স ও আমার লেখা ১৮৪৬ সালের  এক পুরনো পান্ডুলিপিতে আমি বলেছিলাম, ‘ সন্তানের  জন্মদান পুরুষ ও মহিলার মধ্যে প্রথম শ্রম-বিভাজন।৬৩ আর আমি আজ তার সাথে যোগ করছিঃ “ইতিহাসে প্রথম শ্রেণীর বৈপরীত্য এক বিবাহে মানুষ-মানুষীর বৈরিতা-বিকাশ  ও  পুরুষ কর্তৃক নারীর প্রথম শ্রেণীর নিপীড়নের সঙ্গে একাত্ম হয়। সভ্য সমাজের কোষ এক বিবাহ, যার ভিত্তিতে আমরা বৈপরীত্য ও দ্বন্দ্বের চরিত্র বীক্ষণ করেছি , যা পরবর্তী কালে পূর্ণ বিকশি্রেছিলেন।৬৪
দুই লিঙ্গের তূল্যমূল্যতা নিয়ে  মার্ক্স মর্গ্যানের বিবেচনার প্রতি গভীর মনোনিবেশ করেছিলেন।সেখানে যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে প্রাক-গ্রীক প্রাচীন সমাজে  নারীদের প্রতি ব্যবহার ও আচরণ ছিল প্রগতিশীল। মর্গ্যানের বই থেকে সেই অংশগুলি মার্ক্স উৎকলিত করেছেন ‘যেখানে দেখানো হয়েছে কিভাবে নারী থেকে পুরুষে পরম্পরাগত পরিবর্তন স্ত্রী ও নারীর অবস্থান ও অধিকার বিক্ষত করেছিল।’ গ্রীক সামাজিক মডেল সম্পর্কে মর্গ্যানের মূল্যায়ন ছিল নেতিবাচক। ‘গ্রীক সভ্যতার শীর্ষ পর্যায়ে গ্রীকেরা নারীদের প্রতি আচরণে বর্বরতা জারী রেখেছিল, শিক্ষা ছিল ভাসা ভাসা।
....যতদিন না নারীরা মেনে নিয়েছিল তাদের মধ্যে নীতিগতভাবে  হীনমন্যতা গেঁথে দেওয়া হয়েছিল’। উপরন্তু ‘নারীদের মান্যতা হ্রাসকরণের জন্য নীতিগতভাবে পুরুষদের মধ্যে  এক চর্চিত স্বার্থান্বেষ ছিল, যা পাশবদের মধ্যেও বিরল।’ পুরাকথার সাথে ধ্রুপদী বিশ্বের বৈপরীত্যের কথা ভেবে মার্ক্স এ সম্পর্কে এক তীক্ষ্ণ মন্তব্য করেছেন, “অলিম্পাস-এ দেবীদের অবস্থা নারীদের অবস্থান মনে করিয়ে দেয়, যারা একদা বেশী মুক্ত ও অধিকতর প্রভাবশালী ছিল। জিউসের মস্তিষ্ক থেকে ক্ষমতার লোভে জ্ঞানের দেবী জুনো জন্মালেন ইত্যাদি ইত্যাদি।৬৫  মর্গ্যানের রচনাবলী পড়ে সম্পত্তি সম্পর্কের উৎস নিয়ে  মার্ক্স অন্য একটি বিষয়ে একটা দৃষ্টিকোণ পেলেন।কারণ প্রথিতযশা নৃতত্ববিদ নানা বংশকুল কাঠামোগুলির মধ্যে এক নৈমিত্তিক সম্পর্ক নির্দিষ্ট করেছিলেন।তাঁর মতে প্রতীচ্যের ইতিহাসে এটাই বর্ণনাত্মক ব্যবস্থার প্রতীয়মানতা, যা আত্মীয় ও বংশগত রক্ত সম্পর্ক (যেমন ভ্রাতার পুত্র ভ্রাতুষ্পুত্র, পিতার ভ্রাতা পিতৃব্য,পিতার ভ্রাতৃপুত্র খুল্লতাত ভ্রাতা)- ও আত্মীয়তা শর্তাবলীর  (যা নিকট–দূরগত অহমিকা অর্থাৎ নিজের ভাই আর  বাবার ভাইয়ের ছেলেকে এক সারিতে ভাবা   ধমনীগত আত্মীয়দের বিভিন্ন গোষ্ঠী গড়ে অবনমন চিহ্নিত করে, সম্পত্তি ও রাষ্ট্রের বিকাশ এভাবেই ঘটেছে।৬৬                           
মর্গ্যানের বইয়ের চারটি অংশঃ (১) উদ্ভাবন ও আবিষ্কারের মাধ্যমে বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ,(২) সরকারী শাসন চিন্তার বিকাশ, (৩) পরিবার ভাবনার বিকাশ ও (৪) সম্পত্তি ভাবনার বিকাশ। মার্ক্স ক্রমবিন্যাস বদল করলেন- (১) উদ্ভাবনা, (২) পরিবার, (৩) সম্পত্তি ও (৪) সরকারী শাসন, যাতে করে শেষ দুটির নৈকট্য স্পষ্ট হয়।
মর্গ্যানের বইতে প্রদত্ত যুক্তি, যদিও  হাজার হাজার বছর ধরে ‘ন্যায় ও বুদ্ধিমত্তা’র উপরে খবরদারী করেছে ‘সম্পদ, পদমর্যাদা ও সরকারী পদের অধিকার, তবু সমাজে যে ‘সুবিধাভোগী শ্রেণিগুলির প্রভাব যে ‘বোঝাস্বরূপ’ তার অনেক প্রমাণ আছে।৬৭ শেষ পৃষ্ঠাগুলিতে সম্পত্তি-সৃষ্ট বিকৃতিকরণ লেখার প্রায় সবটারই মার্ক্স অনুলিপি করেছিলেন নিয়ে থেকে; সে ধারণার রূপায়ন, মার্ক্সের চিন্তনে ছাপ ফেলেছিল।যেমন সভ্যতার সূচনা থেকেই সম্পত্তির এত বিশাল উপবৃদ্ধি ঘটেছিল, তার ধারাউপধারা এত বিস্তৃত হয়েছিল, তার প্রয়োগ এত প্রসারিত ছিল ও মালিকদের স্বার্থে ব্যবস্থাপনায় এত বুদ্ধিমত্তা ছিল ,যে জনগণের একাংশের কাছে তা হয়ে উঠল এক নিয়ন্ত্রণাতীত শক্তি। মানব মন তার নিজের সৃষ্টিই তাকে বিহ্বল করে তুলল।তথাচ  একটা সময় আসবে যখন সম্পত্তির উপর মানুষের বুদ্ধি প্রভুত্ব করতে পারবে, আগলে রাথা সম্পত্তির সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক ও তৎসহ মালিকদের অধিকারের সীমা ও দায় সংজ্ঞায়িত করবে। ব্যক্তিগত স্বার্থের কাছে সমাজের স্বার্থ সবচেয়ে বড়। এবং দুইয়েরই মধ্যে সম্পর্ককে সুসমঞ্জস হতে হবে।
‘মানুষের অন্তিম নিয়তি’ নির্ধারণ করবে সম্পদ মর্গ্যান তা মানতেন না। তিনি কড়া সতর্কবানী উচ্চারণ করেছিলেনঃ ‘
সমাজের দ্রবীভবন হলে সম্পত্তিই যে পেশার অন্ত ও লক্ষ্য তার ইন্তেকাল। কারণ সেই পেশার মধ্যেই নিহিত আত্মবিনাশের উপাদান, কেন না সরকার পরিচালনায় গণতন্ত্র, সমাজে ভ্রাতৃত্ববোধ, নানা অধিকার , সর্বজনীন শিক্ষা  ও বিশেষ সুবিধার ক্ষেত্রে সাম্যে নিহিত সমাজের উচ্চতরস্তরের পূর্বাভাস মেলে, যার অভিমুখ অভিজ্ঞতা, বুদ্ধিবৃত্তি ও জ্ঞান আহরণে । এটি (অর্থাৎ সমাজের উচ্চতর৬৮ ) হবে পুনরুদ্ধার, (সমাজে) মুক্তি,সাম্য ও প্রাচীন কালে শুভ কামনামুলক সৌভ্রাতৃত্বের উচ্চতর রূপ।৬৯
অতএব বুর্জোয়া ‘সভ্যতা ছিল এক উত্তরণের পর্যায়, যা দুই দীর্ঘ যুগের শেষে উৎসারিত – ‘অসভ্য রাজ’ ও ‘বর্বর রাজ’ (যে নামে চালু ছিল সেই সময়), যার পরে সামাজিক সংগঠনের যূথবদ্ধ প্রকৃতির অবসান ঘটল। সম্পত্তির পুঞ্জীভবন এবং সামাজিক শ্রেণীগুলি ও রাষ্ট্রের উত্থান তাকে ভেঙ্গে চূরমার করে দিল। কিন্তু কালক্রমে প্রাক–ইতিহাস ও ইতিহাসের আবার একতাবদ্ধ হতে প্রস্তুত ছিল্।৭০
মর্গ্যানের চোখে প্রাচীন সমাজগুলি ছিল গণতান্ত্রিক ও সংহতিমূলক। তাঁর কালে তিনি রাজনৈতিক সংগ্রামের আহ্বানের প্রয়োজনীয়তা ছাড়াই মানব প্রগতি সম্পর্কে ঘোষণার আশাবাদে নিজেকে সীমিত করে রেখেছিলেন। মার্ক্স-এর  সমাজতান্ত্রিক পুনরুজ্জীবনে ‘অসভ্যদের উন্নয়নের কল্পনা’য় আস্থা ছিল না।  অতীতে প্রত্যাবর্তনের কথা তিনি ভাবতেনই না, কিন্তু মর্গ্যানের বই অনুলিপিকরণের সময় স্পষ্ট বলেছিলেন তিনি ‘সমাজের উচ্চতর স্তরে’ উত্তরণের দিকে’৭১ তাকিয়ে আছেন, যার ভিত্তি হবে নূতন উৎপাদনী উপায় ও উপভোজ্যতা। আর তা যান্ত্রিক পথে নয়, শ্রমিক শ্রেণীর সচেতন সংগ্রামে সম্ভব হবে।     
নৃতত্ববিষয়ক মার্ক্সের সব চর্চা রাষ্ট্রের উৎপত্তি ও প্রক্রিয়ার সঙ্গে অন্বিত ছিল। মর্গ্যান থেকে উদ্ধৃতিগুলি বর্বরতা থেকে সভ্যতায় উত্তরণের সংক্ষিপ্তসার আর মেইন থেকে লেখাজোখা ছিল ব্যষ্টি-রাষ্ট্র সম্পর্কের বিশ্লেষণ।এ বিষয়ে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পাঠ হেগেলের আইনের দর্শনের সমালোচনা (১৮৪৩)৭৩ থেকে ফ্রান্সের গৃহযুদ্ধ (১৮৭১)৭৪ ,নৃকুলগত নোটবুকগুলিতেও আছে সমাজকে রাষ্ট্র ক্ষমতাধীনকরণের কথা, যা ব্যক্তির পূর্ণ মুক্তি অবরোধের শক্তি।
মার্ক্স ১৮৮১ সালে পর্যবেক্ষণে রাষ্ট্রের পরভোজী ও উত্তরণমুখী চরিত্রের উপর জোর দিয়েছিলেনঃ মেইন যে গভীরতর দিকটি উপেক্ষা করছেন তা হল রাষ্ট্রের আপাতস্বরাট স্বাধীন শুধু আপাতদৃষ্টিতেই আর তা সমাজের বাড়তি রূপ গঠন করে যেমন এর বাহ্যিক রূপ পরিগ্রহণ ঘটে সামাজিক বিকাশের কোন বিশেষ স্তর,  সমাজের অনাগত স্তরে উত্তরণ হলে যা অন্তর্হিত হয়। সেই ধারা অনুসরণ করে মার্ক্স তখনকার ঐতিহাসিক পরিপার্শ্বের প্রেক্ষাপটে মানুষিক অবস্থার সমালোচনা লিপিবদ্ধ করলেন। ব্যক্তিগত সম্পত্তি  আছে সবার এমন রাজত্ব থেকে উত্তরণের সাথে সভ্য সমাজ গঠন গড়ে তুলল ‘সেই একপেশে ব্যষ্টি’।৭৫ যদি রাষ্ট্রের ‘প্রকৃত চরিত্র’ প্রতিভাত হয় তখনই যখন আমরা তার মর্মবস্তু অর্থাৎ তার স্বার্থ বিশ্লেষণ করি , যা থেকে প্রতীয়মান হয় তাদের ‘সামাজিক গোষ্ঠী আর সেজন্যই  শ্রেনী স্বার্থও অভিন্ন। কারণ মার্ক্সের চোখে, ‘রাষ্ট্র গড়ে  পূর্ব-নির্ধারিত শ্রেনীই’। এই ধরণের সমাজে ব্যক্তির অস্তিত্ব ‘ব্যষ্টিক শ্রেণী’, যার চূড়ান্ত বিশ্লেষণ ‘প্রাক-নির্ধারিত অর্থনৈতিক ভিত্তিতে’।৭৬   

মার্ক্স তাঁর নৃকুলবিদ্যাবিষয়ক লেখাজোখায় তাঁর অধীত নৃতত্ববিষয়ক সমীক্ষা গুলির জাতপাতবাদী দ্যোতনা সম্পর্কে বেশ কিছু মন্তব্য করেছিলেন।৭৭ সেখানে তিনি ঐ মতাদর্শ সুস্পষ্ট ভাবে খারিজ করেছেন এবং সেই সব লেখকদের সম্পর্কে শ্লেষাত্মক মন্তব্য করেছেন। তাই  মেইনের  পক্ষপাতমূলক বিশেষণ দৃঢ়ভাবে নাকচ করে বলেছেনঃ ‘আজেবাজে কথা’! প্রায়ই লিখেছেন ‘শয়তানই এমন ‘আর্য কুকথা’ লেখে।
জেমস উইলিয়ম বেইলি মানি-র ‘জাভা’ বা ‘হাউ টু ম্যানেজ আ কলোনি’ এবং  ফিয়ার-এর ‘দি এরিয়ান ভিলেজ ইন ইন্ডিয়া অ্যান্ড সিলোন’ বইগুলি অধ্যয়ন করে মার্ক্স এশিয়ায় ইয়োরোপীয়দের উপস্থিতির নেতিবাচক প্রভাবের কথা বলেছেন। তিনি ঔপনিবেশিক নীতি সম্পর্কে মানি-র অভিমত সম্পর্কে আদৌ কৌতূহলী ছিলেন না, কিন্তু বাণিজ্য বিষয়ে বইটিতে বিস্তারিত বর্ণনার উপযোগিতা মেনেছেন।৭৮ ফিয়ার-এর বইয়েও দেখেছেন বঙ্গদেশ সম্পর্কে তথ্যাদি, ঔপপত্তিক গঠনে দুর্বলতা সত্বেও।
নৃকুল বিদ্যাবিষয়ক খাতাপত্রে যে সব গ্রন্থকারের লেখা পড়ে সারাংশ লিখেছেন সেগুলি নানা সূক্ষ্ম ভেদে প্রভাবিত হয়েছিল – যুগগত বিবর্তনীয় ধারণায়, কিছু আবার বুর্জোয়া সভ্যতার শ্রেষ্ঠত্ব দাবিতে। কিন্তু নৃকুল বিদ্যাবিষয়ক খাতাপত্রগুলি বিচার করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে তাদের মতাদর্শগত আরোপন মার্ক্সের ওপর কোনো প্রভাব ফেলেনি।
প্রগতির তত্বগুলি ঊনবিংশ শতাব্দীতে কর্তৃত্বময় এবং নৃতত্ত্ববিদ ও নৃকুলবিদেরা ব্যাপকভাবে মান্য করেছিল, স্বীকার করেছিল যে ঘটনাপ্রবাহ মানবকর্ম-বহির্ভূত দিশার কারণে  পূর্বনির্ধারিত পথ চলবে এক সুদৃঢ় স্তর-পরম্পরা পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বের জন্য একম ও সুষম দিক নির্দেশপানে।       
কয়েক বছরের পরিষরে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকে এক সরল বিশ্বাস গ্রথিত হল যে ইতিহাস স্বয়ংজাত গতি পাবে। বুর্জোয়া ভাষ্যের সাথে তফাত কেবল এই যে শেষ স্তরে পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিপর্যয় অবশ্যম্ভাবী ( পরে যা ‘মার্ক্সবাদী’ সংজ্ঞায়িত হয়েছিল।৭৯   
এই বিশ্লেষণ শুধু চেতনাগতভাবে অসার ছিল তা নয়, এ থেকে উদ্ভুত হয় এক ধরণের অদৃষ্টবাদী নিস্ক্রিয়তা, যা বহমান ব্যবস্থাকে স্থায়িত্ব দেয় ও সর্বহারাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক ক র্মকান্ডকে দুর্বল করে।মার্ক্স এই  দৃষ্টিকোন নাকচ করেছিলেন যদিও অনেকের কাছে তা ’বিজ্ঞানসম্মত’ মনে করে এবং যা প্রগতির বুর্জোয়া ও সমাজতান্ত্রিক ভাবনায় পরস্পর সদৃশ, কারণ এউ আহ্বান-শঙ্খ একপেশে ইতিহাসভাবনা। তিনি লালন করেছিলেন তাঁর জটিল, নমনীয় ও বৈচিত্রপূর্ণ ধারণা।     
ডারুয়িনীয় প্রত্যাদেশের তুলনায় মার্ক্সের কন্ঠ অনিশ্চিত ও দ্বিধান্বিত মনে হতে পারে।৮০ তিনি প্রকৃতপক্ষে অর্থনৈতিক পরিনামবাদের ফাঁদে পা দেন নি, যদিও তাঁর অনুগামীদের ও আপাত-মতবাদীদের অনেকে সে ফাঁদে পা দিয়েছিলেন যা   তাঁদের ঘোষিত প্রেরণাদায়ী  তাত্বিক থেকে কয়েক আলোকবর্ষ দূরে ঠেলে দিয়েছিল মার্ক্সবাদের নিকৃষ্টতম ব্যাখ্যাতা করে তুলেছিল।  
তাঁর পান্ডুলিপি,লেখাজোখার খাতাপত্র, কমরেড ও বন্ধুদের লেখা চিঠিপত্র এবং প্রকাশ্য আলোচনায় পারিবারিক টানাপোড়েন ও শারীরিক অবনতি সত্বেও তিনি সক্রিয় ছিলেন, প্রাচীনতা থেকে পুঁজিতন্ত্রে উত্তরণের জটিল ইতিহাসের কাঠামো পুন র্নিমাণের অধ্যবসায় অব্যাহত রেখেছিলেন। নৃতত্ববিষয়ক অধ্যয়ন ও তার ভিত্তিতে সারবত্তা থেকে তিনি স্থির বিশ্বাসে উপনীত হয়েছিলেন যে মানব প্রগতি দ্রুত হয়েছে সেই যুগগুলিতে অর্থাৎ   কৃষিকার্যের শুরু থেকেই  বেঁচে বততে থাকার উৎসগুলি প্রসারিত হয়েছে। তিনি ঐতিহাসিক  তথ্য ও পরিসংখ্যানে সমৃদ্ধ করেছিলেন, কিন্তু রেখে যান নি কঠোর পদ্ধতি সূত্রগুলি যাতে আছে মানবেতিহাসের অনিবার্য স্তর পরম্পরার অভিভাবনা।  
অর্থনৈতিক রূপান্তরের সঙ্গে সামাজিক পরিবর্তনই অন্বিত, মার্ক্স তা মানতেন না। পরন্তু তিনি ঐতিহাসিক পরিস্থিতির বিশেষ দিকগুলি, কালপ্রবাহ-সৃষ্ট নানা সম্ভাবনা, বাস্তবতার রূপগঠনে মানব হস্তক্ষেপের কেন্দ্রীয় ভূমিকা ও পরিবর্তনের সাফল্য তুলে ধরেছেন।৮১ তাঁর জীবনের শেষ বছরগুলিতে মার্ক্সের ঔপপত্তিক ব্যাখ্যানের মুখ্য বৈশিষ্ট্য এগুলিই।
নৃকুলবিদ্যাগত গবেষণার পাশাপাশি,মার্ক্স ১৮৮১-র প্রথমার্ধে গণিত চর্চায় মনোনিবেশ করেছিলেন , যা ইতিপূর্বেই তাঁর কাছে ছিল এক চ্যালেঞ্জ। এঙ্গেলসকে ১৮৫৮ সালে এক চিঠিতে লিখেছিলেন গ্রুন্দ্রিসি লেখার সময় তিনি আঙ্কিক হিশেবে এত ভুল করেছিলেন যে হতোদ্যম হয়ে বীজগণিত পুনরধ্যয়নে নিয়োজিত করেছিলেন,“ পাটিগণিতে  এত স্বাচ্ছন্দ্য আগে কখনো অনুভব করিনি, কিন্তু বীজগণিতের মোচড়গুলি মারফৎ আমি ঠিক জায়গায় পৌঁছতে পারলাম’ ,একথা কবুল করেছিলেন।৮২ প্রথমদিকে,মার্ক্স-এর কৌতূহল ছিল সংখ্যা-বিজ্ঞানে, রাজনৈতিক অর্থনীতি বীক্ষণে ও তার সাথে প্রাসঙ্গিক ঔপপত্তিক সমস্যা সমাধানের জন্য। কিন্তু একবার তার মধ্যে ঢুকে যেতে পারলে তাঁর আচরণে নিবিড় পরিবর্তন ফুটে ঊঠত। ‘পুঁজি’ রচনায় প্রয়োজন ছাড়াও, গণিত তাঁর কৃষ্টিগত ভাবনার সূত্র  ও বৌদ্ধিক কর্মেও বিশেষ স্থান অধিকার করেছিল।
তাঁর স্ত্রী ১৮৬০ সালে বসন্ত রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। ছোঁয়াচে রোগ বলে মেয়েদের অন্যত্র পাঠানো হয়েছিল। মার্ক্স নিজেকে ‘নার্স’এর ভূমিকা নিয়েছিলেন, সেকথা এঙ্গেলসকে লিখলেন, “এখন প্রবন্ধ লেখার (ন্যু ইয়র্ক ট্রিব্যুনের জন) প্রশ্নই ওঠে না। মানসিক শান্তির জন্য শুধু গণিত অধ্যয়ন বজায় রেখেছি.৮৩ শেষ দিন অব্দি এই মনোনিবেশ ছিল মার্ক্সের।  
এঙ্গেলসকে অনেক চিঠিতে মার্ক্স এই চিত্তসুখের কথা লিখেছেন। তিনি ১৮৬৫ সালের গ্রীষ্মে লিখলেন ‘পুঁজি’ (যা লেখা শেষ করতে তিনি’ঘোড়ার মত গতিতে’ কাজ করছেন, কারণ শরীরে বিস্ফোটগুলি তাঁকে ক্রমাগত কস্ট দিলেও ‘মস্তিস্ককে উত্যক্ত করতে পারেনি)) লেখার বিরতিকালে ‘ডিফারেনশিয়াল ক্যালকুলাস’ চর্চা করছিলেন । “ অন্য সব অধ্যয়ন আমাকে সদাই লেখার কাজে ঠেলে দিচ্ছে.৮৪
মার্ক্স ১৮৭০ দশকে এই মনোনিবেশ বজায় রেখেছিলেন।৮৫ তার শেষে তিনি সুসংবদ্ধভাবে কয়েকশত পৃষ্ঠা জুড়ে যা লিখলেন্ম তা মার্ক্সের ‘গাণিতিক পান্ডুলিপি’ নামে খ্যাত।৮৬
মার্ক্স ১৮৮১ সালে আইজ্যাক নিঊটন(১৬৪৩-১৭২৭) ও গটফ্রিড হ্বিলহেইম লিবনিৎস(১৬৪৬-১৭১৬)এর গাণিতিক তত্ব অধ্যয়নে মনোনিবেশ করছিলেন । তাঁরা স্বতন্ত্রভাবে৮৭ ইংল্যান্ড ও জর্মনীতে ডিফারেনশিয়াল ক্যালকুলাস ও ইন্টিগ্রাল ক্যালকুলাস উদ্ভাবন করেন, যা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ক্যালকুলাস-এর দুই অঙ্গ। সেই পাঠ শেষে মার্ক্স দুটি ছোট পান্ডুলিপি লিখেছিলেনঃ ‘অন দি কনসেপ্ট অফ দি ডিরাইভড ফাংশ্যন’ ও ‘অন দি ডিফারেনশিয়াল’ যাতে তিনি ডিফারেনশিয়াল ক্যালকুলাস সম্পর্কে তাঁর ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন ও তিনি যে পদ্ধতি আবিস্কার করেছিলেন,৮৮ তা বিবৃত করেছিলেন। লেখা শেষ হলেই দুটিই এঙ্গেলসকে মন্তব্যের জন্য পাঠিয়ে দিয়েছিলেন , তাঁকেই উৎসর্গ করেছিলেন।
ডিফারেনশিয়াল ক্যালকুলাস-এর ইতিহাস ও উৎপত্তি নিয়ে মার্ক্সের চর্চার সাথে ছিল নানা লেখাজোখা-সমন্বিত টিকা ও প্রাথমিক খসড়াদি,৮৯ যার সারকথা ছিল  ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ক্যালকুলাস-এর ভিত্তি সমালোচনা, মৌল গণিতের dx ও dy অস্তিত্ব অস্বীকার করা।৯০ এই গবেষণা কালে নিঊটন ও লিবনিৎস-এর ডিফারেনশিয়াল ক্যালকুলাস-এর ‘অস্পস্ট’ ভিত্তি লক্ষ্য করেছিলেন, কারণ কেঊই তার ব্যাখ্যা দেন নি।মার্ক্স-এর সমালোচনার কারণ সংজ্ঞায়ন ছাড়াই তার প্রবর্তনা।৯১          
          
 এই ঋণাত্মক দিকটা অন্য গণিতবিদদের কাছেও প্রতিভাত হয়েছিল, যেমন জঁ দ্যলেমবেইয়ার (১৭১৭-১৭৮৩) ও জোসেফ-লুই লাগ্রাঞ্জ ( ১৭৩৬-১৮১৩) যাঁদের থিসিস মার্ক্স যথেষ্ট কৌতূহল নিয়ে পড়েছিলেন। প্রথমটি যুক্তিবাদী ভিত্তিতে ও ‘লিমিট’ ধারণা-ভিত্তিক। দ্বিতীয়টি শুদ্ধ বীজগাণিতিক পদ্ধতি ও উদ্ভূত অন্বয় (ফাংশ্যন)। কিন্তু কেউই মার্ক্স-নির্দিষ্টকৃত সমস্যার সমাধান করতে পারেন নি।
      

               
1 See the chapter ‘John Swinton, Crusading Editor’, in Sender Garin, Three American Radicals: John Swinton, Charles P. Steinmetz, and William Dean Howells. Boulder: Westview Press, 1991, pp. 1-41.
 2 See the police report ‘[Declaration by Karl Marx on His Naturalisation in England]’, in MECW, vol. 24, p. 564.
3 Karl Marx to Ferdinand Nieuwenhuis, 27 June 1880, in MECW, vol. 46, p. 16.
4 Karl Marx to Nikolai Danielson, 12 September 1880, in MECW, vol. 46, p. 30.
5 Karl Marx, ‘[Account of an Interview with John Swinton, Correspondent of The Sun]’,
6 September 1880, in MECW, vol. 24, pp. 583-4. 6 Ibid., p. 583.
7 Ibid.
8 Ibid., p. 585
 9 Ibid.
10 For a description of Marx’s previous study at o. 1 Maitland Park Road see Paul Lafargue, in Institute of Marxism-Leninism (Ed.), Reminiscences of Marx and Engels. Moscow: Foreign Languages Publishing House, 1957, pp. 73-4.
 11 See Hans-Peter Harstick, Richard Sperl and Hanno Strauß, 'Einführung', in Karl Marx and Friedrich Engels, Die Bibliotheken von Karl Marx und Friedrich Engels, MEGA², vol. IV/32, p. 73. This volume of more than 730 pages, which is the fruit of seventy-five years of research, includes an index of 1,450 books (2,100 volumes) – two-thirds of the total belonging to Marx and Engels (2,100 books in 3,200 volumes) – as well as a listing of all the book pages to which he appended notes. It also contains references to Marx’s marginal comments on 40,000 pages of 830 texts.
 12 s.n., ‘[Account of Karl Marx’s Interview with the Chicago Tribune Correspondent]’, Chicago Tribune, 5 January 1879, in MECW, vol. 24, p. 569
13 Lafargue, in Institute of Marxism-Leninism (ed.), Reminiscences of Marx and Engels, op. cit., pp. 73-4. On Marx’s vast literary interests and knowledge, see Siebert S. Prawer, Karl Marx and World Literature. London: Verso, 2011, p. 100.
14 Lafargue, in Institute of Marxism-Leninism (ed.), Reminiscences of Marx and Engels, op. cit., pp. 73-4.
15 Karl Marx to Paul Lafargue, 11 April 1868, in MECW, vol. 43, p. 10.
16 Karl Marx, A Contribution to the Critique of Political Economy, in MECW, vol. 29, p. 264.
17 A year after Marx’s death, Engels wrote to Laura Lafargue on 16 February 1884: ‘We have got the old ‘storehouse’ at last cleared out, found a whole lot of things that have to be kept, but about half a ton of old newspapers that it is impossible to sort. […] Amongst the manuscripts there is the first version of Capital (1861-63) and there I find several hundred pages: Theories of Surplus Value’, in MECW 46, p. 104.
 18 Lafargue, in Institute of Marxism-Leninism (ed.), Reminiscences of Marx and Engels, op. cit., p. 74.
 19 Henry Hyndman, Record of an Adventurous Life. London: Macmillan, 1913, p. 250.
 20 Lafargue, in Institute of Marxism-Leninism (ed.), Reminiscences of Marx and Engels, op. cit., p. 74.
21 See Asa Briggs and John Callow, Marx in London: An Illustrated Guide. London: Lawrence and Wishart, 2008, pp. 62-5.
22 Marian Comyn, ‘My Recollections of Marx’, in The Nineteenth Century and After, vol. 91, January 1922, p. 100.
23 In July 1870, as joint inheritor of the sewing-thread producer, Ermen & Engels, Friedrich Engels sold his share in the business and received sufficient capital to guarantee a decent living for himself and the Marx family.
 24 Karl Marx to Nikolai Danielson, 19 February 1881, in MECW, vol. 46, p. 61.
25 Karl Kautsky, in Hans Magnus Enzensberger (ed.), Gespräche mit Marx und Engels. Frankfurt/Main: Insel Verlag, 1973, p. 556.
26 Comyn, ‘My Recollections of Marx’, op. cit., p. 100.
27 Karl Marx to Jenny Longuet, 11 April 1881, in MECW, vol. 46, p. 82.
28 Comyn, ‘My Recollections of Marx’, op. cit., p. 100.
29 Karl Marx to Jenny Longuet, 11 April 1881, in MECW, vol. 46, op. cit., p. 82.
30 s.n., ‘[Sir Mountstuart Elphinstone Grant Duff’s Account of a Talk with Karl Marx. From a Letter to Crown Princess Victoria]’, 1 February 1879, in MECW, vol. 24, p. 580.
31 Edward Bernstein, My Years of Exile. London: Leonard Parsons, 1921, p. 156.
32 Karl Kautsky, in Enzensberger (Ed.), Gespräche mit Marx und Engels, op. cit., p. 556.
33 Ibid., p. 558.
34 Ibid., p. 556.
35 Comyn, ‘My Recollections of Marx’, op. cit., p. 100.
 36 Karx Marx to Nikolai Danielson. 19 February 1881, in MECW, vol. 46, p. 60.
 37 Ibid., p. 61.
38 These were the diminutives that Marx used for his three grandsons: Jean, Henri and Edgar Longuet. The youngest later recalled that his grandfather ‘played with children as if he were a child himself, without worrying in the slightest that it might undermine his authority. In the local streets he was called ‘Papa Marx’. He always carried sweets in his pocket to give to children. Later, he transferred this love to his grandchildren’, Edgar Longuet, in Enzensberger (ed.), Gespräche mit Marx und Engels. op. cit., p. 579. Bebel recalled how Marx ‘knew how to play with the two grandchildren and how much love he had for them’, August Bebel, in ibid., p. 528; Liebknecht that ‘for Marx the company of children was a need: it was at once refreshing and restorative’,Liebknecht, in ibid., p. 541; and Hyndman that ‘children liked him and he played with them as friends’, in Hyndman, Record of an Adventurous Life, op. cit., p. 259.
 39 Karl Marx to Jenny Longuet, 11 April 1881, in MECW, vol. 46, p. 81.
40 Karl Marx to Jenny Longuet, 29 April 1881, in MECW, vol. 46, p. 89.
41 Ibid.
 42 Karl Marx to John Swinton, 2 June 1881, in MECW, vol. 46, p. 93.
43 Friedrich Engels to Jenny Longuet, 31 May 1881, in MECW, vol. 46, p. 77.
44 Karl Marx to Jenny Longuet, 6 June 1881, in MECW, vol. 48, p. 95.
45 In 1918, in his Karl Marx: The Story of His Life. Ann Arbor: University of Michigan Press, 1962, Franz Mehring described the claim that Marx’s final decade was ‘a slow death’ as ‘greatly exaggerated’, p. 501. But he also asserted incorrectly that ‘since 1878 he had done nothing further to complete his main work’, p. 526. David Ryazanov showed in 1923 that ‘although in 1881-1883 he lost some of his faculty for creative work, he never lost his appetite and capacity for research’, ‘Neueste Mitteilungen über den literarischen Nachlaß von Karl Marx und Friedrich Engels’, in Archiv für die Geschichte des Sozialismus und der Arbeiterbewegung, vol. 11 (1925), p. 386. In 1929, in his Karl Marx, Leipzig: F. Meiner, Karl Vorländer stated that ‘for a man who matured so early, but who had suffered so many trials, physical old age set in earlier than for many others’, p. 255, adding that ‘from 1878 he felt more often and to an ever greater extent incapable of work’, p. 291. A decade later, Isaiah Berlin echoed: ‘He wrote less and less, his style grew more crabbed and obscure’, Karl Marx: His Life and Environment. London: Oxford University Press, 1963, p. 280. The last period of Marx’s labours was certainly difficult, and often tortuous, but it was also very important  theoretically.
46 Karl Marx to Nikolai Danielson, 19 February 1881, op. cit., p. 61.
 47 Karl Marx, The Ethnological Notebooks of Karl Marx, Lawrence Krader (ed.). Assen: Van Gorcum, 1972. Marx did not leave a precise dating of his work. Krader, the main researcher of these texts, argues that Marx first familiarized himself with Morgan’s book and then compiled the excerpts - see ‘Addenda’, in ibid., p. 87. See also Kautsky’s testimony from his trip to London in March-June 1881 that ‘prehistory and ethnology were then intensively preoccupying Marx’, in Enzensberger (ed.), Gespräche mit Marx und Engels, op. cit., p. 552.
 48 On this point, see the observations in Pierre Dardot and Christian Laval, Marx, prénom Karl. Paris: Gallimard, 2012, p. 667.
49 The gens was a unit ‘consisting of blood relatives with a common descent: see Henry Morgan, Ancient Society. New York: Henry Holt, 1877, p. 35
50 Hyndman, Record of an Adventurous Life, op. cit., pp. 253-4.
 51 Morgan, Ancient Society, op. cit., p. 515.
 52 Ibid., p. 472.
 53 Marx, The Ethnological Notebooks of Karl Marx, op. cit., p. 115.
54 Ibid., p. 292.
55 Ibid., p. 309.
56 Ibid., p. 324.
57 Ibid., p. 281.
 58 Morgan, Ancient Society, op. cit., p. 469.
59 Ibid., p. 120.
60 Ibid., p. 21.
 61 Karl Marx and Friedrich Engels, Manifesto of the Communist Party, in MECW, vol. 46, p. 483. In a note to the 1888 English edition of the Manifesto of the Communist Party, Engels wrote: ‘The inner organization of this primitive communistic society was laid bare, in its typical form, by Lewis Henry Morgan’s crowning discovery of the true nature of the gens and its relation to the tribe. With the dissolution of the primeval communities, society begins to be differentiated into separate and finally antagonistic classes’, ibid.
 62 Engels, The Origin of the Family, Private Property and the State, in MECW, vol. 26, p. 131.
63 Engels is referring to Karl Marx and Friedrich Engels, The German Ideology, in MECW, vol. 5, p. 44. See the part of the so-called ‘Chapter One. Feuerbach’.
64 Engels, The Origin of the Family, Private Property and the State, pp. 173-4. In this work, Engels actually published some of Marx’s comments on Morgan’s book.
65 Marx, The Ethnological Notebooks of Karl Marx, op. cit., p. 121.
66 Ibid., pp. 123 and 104. See Maurice Godelier, Horizon, trajets marxistes en anthropologie, Paris; Francois Maspero 1973, pp. 178-9.
 67 Morgan, Ancient Society, op. cit., p. 551.
 68 The words in brackets were added by Marx, see Marx, The Ethnological Notebooks of Karl Marx, op. cit., p. 139.
69 Morgan, Ancient Society, op. cit., pp. 551-2.
70 See Godelier, Horizon, trajets marxistes en anthropologie, op. cit., pp. 178-9.
71 Marx, The Ethnological Notebooks of Karl Marx, op. cit., p. 139. According to Krader: ‘Marx made it clear, as Morgan did not, that this process of reconstitution will take place on another level than the old, that it is a human effort, of man for and by himself, that the antagonisms of civilization are not static or passive, but are comprised of social interests which are ranged for and against the outcome of the reconstitution, and this will be determined in an active and dynamic way’, Krader, ‘Introduction’, in Marx, The Ethnological Notebooks of Karl Marx, op. cit., p. 14.
72 See ibid., p. 19.
73 In this work, Marx analysed the ‘opposition’ between ‘civil society’ and ‘the state’; the state does not lie ‘within’ society but stands ‘over against it’. ‘In democracy the state as particular is merely particular. […] The French have recently interpreted this as meaning that in true democracy the political state is annihilated. This is correct insofar as the political state […] no longer passes for the whole’, Karl Marx, ‘A Contribution to the Critique of Hegel’s Philosophy of Law’, in MECW, vol. 3, pp. 78 and 30.
74 Thirty years later, the critique is more sharply focused: ‘At the same pace at which the progress of modern industry developed, widened, intensified the class antagonism between capital and labour, the State power assumed more and more the character of the national power of capital over labour, of a public force organized for social enslavement, of an engine of class despotism’, Karl Marx, The Civil War in France, in MECW, vol. 22, p. 329.
 75 Marx, The Ethnological Notebooks of Karl Marx,, op. cit., p. 329. Cf. Krader’s ‘Introduction’, in Ibid., p. 59.
76 Marx, The Ethnological Notebooks of Karl Marx,, op. cit., p. 329.
77 See Krader, ‘Introduction’, op. cit., p. 37, and Christine Ward Gailey, ‘Community, State, and Questions of Social Evolution in Karl Marx’s Ethnological Notebooks’, in Jacqueline Solway (ed.), The Politics of Egalitarianism. New York-Oxford: Berghahn Books, 2006, p. 36.
 78 See Fritjof Tichelman, ‘Marx and Indonesia: Preliminary Notes’, in Schriften aus dem Karl-Marx-Haus, xxx, Marx on Indonesia and India. Trier: Karl-Marx-Haus, 1983, p. 18. See also Engels’s view of Money: ‘It would be a good thing if someone were to take the trouble to throw light on the proliferation of state socialism, drawing for the purpose on an exceedingly flourishing example of the practice in Java. All the material is to be found in Java, How to Manage a Colony […]. Here one sees how the Dutch have, on the basis of the communities' age-old communism, organized production for the benefit of the state and ensured that the people enjoy what is, in their own estimation, a quite comfortable existence; the consequence is that the people are kept in a state of primitive stupidity and the Dutch exchequer rakes in 70 million marks a year’, Friedrich Engels to Karl Kautsky, 16 February 1884, in MECW, vol. 47, pp. 102-3.
79 Cf. Marcello Musto, The Rediscovery of Karl Marx’, International Review of Social, vol. 52 (2007), no. 3, pp. 479-80.
80 See Alessandro Casiccia, ‘La concezione materialista della società antica e della società primitiva’, in Henry Morgan, La società antica. Milano: Feltrinelli, 1970, p. xvii.
 81 See Gailey, Community, State, and Questions of Social Evolution, op. cit., pp. 35 and 44.
 82 Karl Marx to Friedrich Engels, 11 January 1858, in MECW, vol. 40, p. 244.
 83 Karl Marx to Friedrich Engels, 23 November 1860, in MECW, vol. 41, p. 216.
 84 Karl Marx to Friedrich Engels, 20 May 1865, in MECW, vol. 42, p. 159.
85 Engels later recalled an interruption of a few years in Marx’s work on Capital: ‘There was another intermission after 1870, due mainly to Marx’s ill health. As usual, Marx employed this time for studies; agronomics, rural relations in America and, especially, Russia, the money market and banking, and finally natural sciences such as geology and physiology, and above all independent mathematical works, form the content of the numerous excerpt notebooks of this period’, Friedrich Engels, ‘Preface to the First German Edition’, Capital, Volume II, in MECW, vol. 36, p. 7.
 86 See Sofya Yanovskaya, ‘Preface to the 1968 Russian edition’, in Karl Marx, Mathematical Manuscripts. London: New Park Publications, 1983, p. ix.
87 A heated dispute arose between Newton and Leibniz, each accusing the other of plagiarism and advancing claims to have ‘got there first’. See Alfred Rupert Hall, Philosophers at War. Cambridge: Cambridge University Press, 1980, p. 234.
 88 ‘Marx set out his conception of algebraic differentiation and the corresponding algorithm to find the derivative of certain classes of functions.’ Augusto Ponzio, ‘Introduzione. I manoscritti matematici di Marx’, in Karl Marx, Manoscritti matematici. Milano: Spirali, 2005, p. 7.
 89 Marx, Mathematical Manuscripts, op. cit, pp. 35-106.
90 See Lucio Lombardo Radice, ‘Dai ‘manoscritti matematici’ di K. Marx’, in Critica marxista-Quaderni, 1972, 6, p. 273. In his manuscripts, Marx used the term ‘algebric’ for any expression not containing derivative or differential symbols and ‘symbolic’ for expressions containing the figures peculiar to differential calculus, such as dx and dy. See Ponzio, ‘Introduzione’, op. cit., p. 26.
 91 In defence of Newton and Leibniz, it should be pointed out that – with different contents and viewpoints – they created this method calculation only as an algebraic expedient to solve some geometrical problems. They were not concerned to explain its foundations, which remained mysterious and undefined.