Created: Wednesday, 24 October 2018 11:25 | Rate this article
( 0 Votes ) 
| Category: Articles

গ্রুন্দ্রিসি লেখার সময়
১। ১৮৫৭র আর্থ  সংকট ও বিপ্লবের সময়সূচি        


মার্ক্স ১৮৫৬ সালে রাজনৈতিক অর্থনীতি চর্চা সম্পূর্ণ অবহেলা করেছিলেন,কিন্তু আসন্ন আন্তর্জাতিক আর্থ-সংকট হঠাৎ সব কিছু ওলটপালট করে দিল। এক গভীর অনিশ্চয়তার পরিপার্শ্ব সর্বত্র দেউলিয়া-ভীতি ব্যাপকভাবে ছড়ালো। মার্ক্স অনুভব করলেন এটাই সক্রিয় হবার সময় ও এঙ্গেলসকে লিখলেন মন্দার আসন্নতার কথাঃ “ আমার মনে হয়না আমরা বেশিদিন দর্শকের ভূমিকায় সময় অতিবাহিত করতে পারবো” ১ এঙ্গেলস ইতিমধ্যেই আশান্বিত হয়ে সেই মতো ভবিষ্যৎবানী করেছেন।


এখন এক অভূতপূর্ব অসন্তোষ দেখা দেরে, কারণ গোটা ইয়োরোপের উৎপাদনী শিল্প ধ্বংস হতে চলেছে। বাজারে সর্বত্র পণ্যমজুতে আত্যন্তিকতা , উচ্চ শ্রেনীর মানুষেরা ফাঁপড়ে পড়েছে, বুর্জোয়া শ্রেনী সম্পূর্ণ দেউলিয়া এবং আমার বিশ্বাস ১৮৫৭ সালে  বিশৃঙ্খলা চরম পর্যায়ে পোঁছবে।২
সেই দশকের শেষদিকে বৈপ্লবিক আন্দোলনে এক প্রতিপ্রবাহ দেখা গেল , যে আবহে মার্ক্স ও এঙ্গেলস ইয়োরোপীয় সংসদীয় চত্বরে প্রবেশ করতে পারলেন না। ভবিষ্যতের উপর নতুন ভাবে আস্থা রেখে ওঁরা সেই সময় পরস্পর বার্তা বিনিময় করতেন। বহু-প্রতীক্ষিত বিপ্লব্রের ক্ষণ এগিয়ে এলো। মার্ক্সের কাছে এটাই অগ্রাধিকার পেলো। যত শীঘ্র সম্ভব শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে তিনি তাঁর ‘অর্থশাস্ত্র’ নিয়ে লেখা আবার শুরু করলেন।  
মার্ক্সের ১৮৫৭ সালে প্রত্যয় হ’ল যে ক্রম-ঘনীভূত বিশ্ব পরিসরে আর্থ সংকট গোটা ইয়োরোপ জুড়ে এক নতুন বৈপ্লবিক পর্যায় সূচিত করেছে। তিনি ১৮৪৮র গণ অভ্যুত্থানগুলির সময়  থেকেই এই মূহূর্তের জন্য প্রতীক্ষা করছিলেন আর তখন তাঁর মনে হ’ল যে এ কারণে তাঁর এই সম্ভাবনার জন্য অপ্রস্তুত থাকা চলবে না। অতএব তিনি অর্থশাস্ত্র চর্চার উপর জোর দিলেন যাতে তা চূড়ান্ত করে ফেলতে পারেন।

অতীতের সংকটগুলির বিপ্রতীপে, সেবার অর্থনৈতিক ঝড়ের সূত্রপার ইয়োরোপে নয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে হ’ল। জামানত কমে গেলেও ১৮৫৭ সালের প্রথম কয়েক মাসে ন্যু ইয়র্কের ব্যাঙ্কগুলি ঋণের পরিমাণ বাড়ালো। পরিণামে ফাটকাবাজারির বিকাশহেতু  অর্থনৈতিক পরিস্থিতি শোচনীয় হয়ে উঠল। ওহায়ো লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানীর ন্যু ইয়র্ক শাথা দেঊলিয়া হ’ল আর তার ফলে উদ্ভুত শংকায় অসংখ্য সংস্থাও দেউলিয়া হ’ল। ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার উপরেই আস্থা ক্ষুণ্ণ হওয়ায় ঋণ সঙ্কোচন, জামানত বিপুল হ্রাস পেলো ও অর্থপ্রদান স্থগিত হ’ল।       
ঐ অভাবনীয় ঘটনাবলী আঁচ করে মার্ক্স কাজে আবার নেমে পড়লেন। ওহায়ো লাইফ-এর বিপর্যয়ের দিনই ( ২৩ অগাস্ট ১৮৫৭)মানুষের মনে ভীতি সঞ্চারিত হ’ল আর সংকটের বিস্ফোরণ মার্ক্সকে  ‘অর্থনীতি’র ভুমিকা লেখার অবর উৎসাহ যোগালো, যা তার আগের কয়েক বছরে স্তব্ধ ছিল।মার্ক্স ১৮৪৮ সালে পরাজয়ের পরে এক দশক কাল রাজনৈতিক পশ্চাদ্ভবন ও গভীর ব্যস্টিক বিচ্ছিন্নতার মধ্যে ছিলেন। কিন্তু ঐ সংকট বিস্ফারিত হতেই মার্ক্স এক সামাজিক দ্রোহ-পরম্পরার এক নতুন সম্ভাবনার   আসন্নতা অনুধাবন করতে পারলেন। ভেবে দেখলেন তাঁর আশু কর্তব্য অর্থনৈতিক প্রপঞ্চগুলির বিশ্লেষণ যা বিপ্লবের প্রারম্ভের জরুরী। তার মানে যত শীঘ্র সম্ভব লেখা ও তা প্রকাশ করতে হবে , যার পরিকল্পনা তিনি অনেক্সিন ধরেই করছিলেন।           
ন্যু ইয়র্ক থেকে সংকট কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই দ্রুত মার্কিন যুক্ত রাষ্ট্রের অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ল, তার পরে ইয়োরোপ , দক্ষিণ আমেরিকা ও প্রাচ্যে বিশ্ব বাজারের সর্বত্র বিস্তৃত হ’ল । ইতিহাসে সেই প্রথম আবিশ্ব আর্থ সংকট দেখা দিল।ঐ ঘটনাবলী মার্ক্সের চিত্তে বিপুল প্রত্যাশা জাগালো এবং তাঁর বৌদ্ধিক সৃষ্টিশীলতার তুমুল বিচ্ছুরণ ঘটালো। তাঁর জীবনের সবচেয়ে সক্রিয় কালপর্বগুলির অন্যতম হ’ল ১৮৫৭র গ্রীস্ম থেকে ১৮৫৮র বসন্তকাল। সেই সময়ের কয়েকটি মাসে তিনি যত লিখেছিলেন, তার আগের অনুরূপ কালে অত লেখেন নি মার্ক্স। এঙ্গেলসকে ১৮৫৭-র ডিসেম্বরে লিখলেন, “ আমি পাগলের মত প্রতি দিনরাত আমার অর্থনৈতিক পড়াশোনা সমন্বিত করছি যাতে প্রলয় ঘটার আগেই  অন্তত রূপরেখাটা (গ্রুন্দ্রিসি) শেষ করতে পারি।৩
সেই সুযোগে তিনি বললেন সংকট যে অবশ্যম্ভাবী তাঁর এই ভবিষ্যদ্বানী অমূলক ছিল না, কারণ ‘সাটারডে ইকনমিস্ট’ লিখেছে  ১৮৫৩-র শেষভাগ, গোটা ১৮৫৪,  ১৮৫৫-র শরৎকাল ও ১৮৫৬-র আকস্মিক পরিবর্তনগুলির মত ঘটনা ইয়োরোপে কখনো ঘটেনি, একাধিকবার প্রায়-অবধারিত বিপর্যয়মুক্ত হয়নি।৪
তখন মার্ক্সের গবেষণাকর্ম উল্লেখযোগ্য ও ব্যাপৃত হয়ে উঠেছে। আটটি খাতা পূর্ণ হয়েছে ১৮৫৭-র অগাস্ট ও ১৮৫৮-র মে মাসের মধ্যে, যা গ্রুন্দ্রিসি নামে পরিচিত।৫ পাশাপাশি ইয়োরোপে সংকটের বিকাশ নিয়ে ন্যু ইয়র্ক ট্রিবিউন-এর সংবাদ-প্রতিনিধি হিশেবে কয়েক ডজন প্রবন্ধ লিখেছেন। নিজের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি-র তাগিদে নতুন অ্যামেরিকা বিশ্বকোষের জন্য কিছু কিছু অধ্যায়  লিখতে সম্মত হলেন। সবশেষে ১৮৫৭-র অক্টোবর থেকে ১৮৫৮-র ফেব্রুয়ারীর মধ্যে তিনটি উদ্ধৃতি গ্রন্থের পান্ডুলিপিঁ রচনা সম্পূর্ণ করলেন, যা ক্রাইসিস নোটবুক্স নামে খ্যাত।৬ এগুলির জন্যেই  হেগেল-র সায়েন্স অফ লজিক(১৮১২-১৮১৬) এর চর্চাকার বলে মার্ক্সের  পরিচিতির অবসান সম্ভব হয়েছিল এবং ১৮৫৭-৫৮ পান্ডুলিপি প্রণয়ণের প্রেরণা পেয়েছিলেন। ৭ কারণ সেই সময় তিনি সেই সব ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন যা তাঁর দীর্ঘ-মেয়াদে বড় আকারের সংকট-এর ভবিষ্যদ্বানীর সাথে সম্পর্কিত ছিল।
আগেকার উদ্ধৃতি-নির্ভর লিপিবদ্ধকরণের মত এগুলি অর্থশাস্ত্রজ্ঞদের রচনাবলীর বস্তুসার নয়, শেয়ার বাজারে দর, বাণিজ্যিক লেনদেনের ওঠানামা, এবং ইয়োরোপ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বের অন্যত্র  প্রধান প্রধান অধমর্ণতা সংক্রান্র  বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে গৃহীত তথাবলীর বিস্তারিত লেখাজোখা। এঙ্গেলসকে ডিসেম্বরে লিখলেন তাঁর প্রস্তুতির গভীরতার কথা জানালেনঃ “আমি ভোর ৪টে অব্দি প্রবল উদ্যমে কাজ করছি। আমি দুভাবে নিজেকে নিয়োজিত করছি। ১) রাজনৈতিক অর্থনীতির বিস্তৃত রূপরেখার কাজ ( জনসাধারণের ও আমার নিজের দুয়েরই বিষয়টির গভীরে যাওয়া জরুরী, যাতে এই দূঃস্বপ্ন থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। ২) বর্তমান সংকট (ন্যু ইয়র্ক) ট্রিবিউনের লেখা ছাড়াও আমাকে এসবগুলির নথিপত্র রাখতে হচ্ছে, যা যথেস্ট  সময়সাপেক্ষ। আমি মনে করি এই বসন্তকালের মধ্যে একটি প্রচার পুস্তিকা প্রকাশ করে জর্মন জনসাথারণকে জানিয়ে দিতে হবে হবে যে আমরা যেমন ছিলাম, সদা তেমনই আছি”।৮  
মার্ক্স দ্বিতীয় ধারণায় লেগে থাকেন নি, যাতে তিনি তাঁর যাবতীয় প্রয়াস গ্রুন্দ্রিসির প্রতি নিবদ্ধ থাকে।
২ ইতিহাস ও সমাজে ব্যক্তি
কোথা থেকে শুরু করা যায়? কি করে রাজনৈতিক অর্থনীতির সমালোচনা শুরু করা যায়, হওয়া যা এক উচ্চাশাপূর্ণ ও চাহিদাভিত্তিক প্রকল্প যা মার্ক্স আগে শুরু করলেও বারবার বাধাপ্রাপ্র হয়েছে ? কি করে এ কাজে আবার হাত দেওয়া যায় সেই প্রশ্ন তাঁর নিজেরই। এর সমাধানে  দুটি পারিপার্শ্বিকতা  গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিলঃ তাঁর মতে অর্থবিজ্ঞানের কিছু কিছু তত্ত্ব মান্য হলেও তখনো চেতনালব্ধ ছিল না , যা বাস্তবকে বিধৃত ও ব্যাখ্যা করতে পারে৯ এবং তার আগে  তিনি তাঁর যুক্তিগুলি প্রতিপন্ন করা ও তা উঁপস্থাপন পরম্পরার তাগিদ  অনুভব করলেন। এই ভাবনাগুলিই তাঁকে প্রক্রিয়ার সমস্যাগুলি সম্পর্কে ও গবেষণার দিশারী নীতিগুলি সূত্রায়নের জন্য গভীর অন্বেষণে দায়বদ্ধ করল। এই উত্তরণের ফলই তাঁর সবচেয়ে বেশী বিতর্কসৃষ্টিকারী পান্ডুলিপিগুলির অন্যতম –‘গ্রুন্দ্রিসির উপক্রমনিকা’।ঐ পৃষ্ঠাগুলির মধ্যেই তিনি তাঁ সময়ের বেশ কিছু মহীরুহপ্রতিম অর্থশাস্ত্রজ্ঞ ও দার্শনিকদেদের মোকাবিলা করেছেন, মার্ক্স সেখানে তাঁর গভীর বিশ্বাস পুনর্প্রত্যয়িত করে তাৎপর্যপূর্ণ ঔপপত্তিক সিদ্ধান্নবলীতে উপনীত হয়েছেন ।কেতাবী পদ্ধতি-ভিত্তিক লেখা কখনোই মার্ক্সের অভিপ্রায় ছিল না, সমুখে এক দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল পথের কথা ভেবে তিনি দেয়েছিলেন নিজের কাছে ও পাঠককুলের কাছে প্রাঞ্জলতা। মধ্য-১৮৪০ দশক হ’তে তাঁর পুঞ্জিত বিপুল অর্থনৈতিক অধ্যয়নের ভিত্তিতে লেখাজোখা পুনর্লিখনের বিশাল কর্মকান্ডের জন্য এটা জরুরী ছিল।সেজন্যে ঔপপত্তিক বিষয়গুলির প্রয়োগ ও স্পস্টোচ্চারণের উপর তাঁর মন্তব্যের পাশাপাশি ঐ পান্দুলিপি-পৃষ্ঠাগুলিতে থাকবে তাঁর ভাবনানুসারে নির্মিত সূত্রাবলী যা তাঁর মর্মবস্তু নবীকরণে অপরিহার্য – বিশেষত সেগুলি তাঁর ইতিহাস-ভাবনার সাথে সম্পর্কিত – ও তৎসহ অ-সূষ্ঠু প্রশ্নাবলী যার সমাধান সমস্যান্বিত।
অত্যল্প সময়ে (বড় জোর এক সপ্তাহ)  এই প্রয়োজনীয়তা ও উদ্দেশ্যের মিশ্রণ এবং সর্বোপরি ঐ লেখাজোখা অস্থায়ী চরিত্র হবার দরূণ অত্যন্ত জটিল ও বিতর্কিত। তথাচ,যেহেতু জ্ঞানতাত্বিক দিক থেকে এমন  ব্যাপকতম ও বিস্তৃত ঘোষণা মার্ক্স আগে কখনো করেন নি, ঐ ‘উপক্রমনিকা তাঁর চিন্তা অনুধাবনের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকা১০ গ্রুন্দ্রিসি সামগ্রিকভাবে ব্যাখ্যানে সহায়ক।
তাঁর লেখন শৈলীর সঙ্গে সঙ্গতি রেখে মার্ক্স ‘উপক্রমনিকা’য় তাঁর নিজের ভাবনাবলী অভিব্যক্ত করা ও তাঁর তত্বগত বিরোধীদের সমালোচনা দুইই তুল্যমূল্য করেছিলেন। সেটা চারটি বিভাগে ভাগ করে ছিলেন
১)সাধারণভাবে উৎপাদন,
২)উৎপাদন, বন্টন, বিনিময় ও ভোগের মধ্যে সাধারণ সম্পর্ক,
৩)রাজনৈতিক অর্থনীতির প্রণালী, ও
৪)উৎপাদনের উপায়গুলি (শক্তিগুলি), উৎপাদনের সম্পর্ক ও সরবরাহ ইত্যাদির সম্পর্কগুলি। ১১

প্রথম বিভাগের শুরুতেই আছে উদ্দেশ্য-সম্পর্কিত ঘোষণা, নিরীক্ষার ক্ষেত্র ও তার ইতিহাসগত নির্ণায়কঃ ‘ আমরা শুরু করছি  বস্তুগত উৎপাদন ও সমাজে উৎপাদনরত ব্যক্তিদের নিয়ে – অর্থাৎ সমাজ-নির্ধারিত ব্যষ্টিক উৎপাদন –যেখান থেকে  আমাদের নিঃসরণ’। মার্ক্সের বিতর্কগত লক্ষ্য অষ্টাদশ শতাব্দীর রবিন্সন ক্রুসো-অনুসারীরা১২  , অর্থনৈতিক মানুষের পরাকাষ্ঠা হিশেবে  রবিন্সন ক্রুসোর মিথস্ক্রিয়া চূর্ণ করণ ১৩ । অথবা অন্য যে কোন সমাজের প্রায়াহ্নে বুর্জোয়া যুগের প্রবাহ উপস্থাপন প্রয়াস খন্ডন।এই ধারণাগুলিই যে কোন শ্রম-প্রক্রিয়ার এক ধ্রুব সামাজিক উতপাদনী চরিত্র প্রতিফলিত করে। এভাবেই অষ্টাদশ শতাব্দীর সুশীল সমাজ (Bürgerliche Gesellschaft)আত্মপ্রকাশ করেছিল, ব্যষ্টি অতীতের ঐতিহাসিক কাল প র্যায়গুলির স্বাভাবিক সামাজিক বন্ধনগুলি থেকে বিচ্ছিন্নকরণের পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল, যাতে তারা নির্দিষ্ট ও পিন্ডিভূত হয়ে ওঠে-যেন তা আগে থেকেই ছিল।১৪
প্রকৃতপক্ষে, পুঁজিতান্ত্রিক যুগের আগে ব্যক্তি বিচ্ছিন্নভাবে নিরস্তিত্ব ছিল। গ্রুন্দ্রিসির একটি অনুচ্ছেদে মার্ক্স লিখেছেন, “ মূলে সে প্রজাতিভুক্ত আদিবাসী ও যূথবদ্ধ প্রাণী। ১৫ এই যৌথ মাত্রাই ধরিত্রীর অধিকরণ –“ এক  বিশাল কারখানা, আশ্রয় যা দেয় শ্রমের উপাদান ও উপায় উভয়ই এবং অবস্থিতি যা সমগ্র সামাজিক সম্প্রদায়ের ভিত্তি( Basis des Gemeinwesens )।১৬ আদিম সম্পর্কের মাঝে মানুষের কাজের সাথে ধরিত্রীর প্রত্যক্ষ অন্বয় গড়ে উঠেছিল এই  ঔপাদানিক প্রাক-ধারণার স্বাভাবিক ঐক্য বিদ্যমান’, এবং ব্যষ্টি ও সমষ্টির অন্যোন্যজীবিত্ব গঠিত। ১৭  ঠিক তেমনই পরবর্তীকৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক রূপগুলিতে ব্যষ্টির কাজ ব্যবহার-মূল্য ও বিনিময়-মূল্য সৃষ্টি,১৮  ‘সমস্টিগত সমবায়ের অংশ হিশেবে’ তার উপস্থিতিতে ব্যষ্টির সঙ্গে ‘শ্রমের বিষয়গত সম্পর্ক’ গড়া, যে শৃঙ্খলে ব্যষ্টিই যোগসূত্র।১৯  মার্ক্স উপক্রমনিকায় লিখেছেনঃ
পুঁজির প্রথম খণ্ডেও অনুরূপ ভাবনা আছে। এখানে ‘অন্ধকারাচ্ছন্ন ইয়োরোপীয় মধ্যযুগ’ সম্পর্কে মার্ক্স যুক্তিসহ বলছেন, ´স্বনির্ভর মানুষ নয়, সর্বত্র আমরা দেখছি প্রত্যেকেই পরনির্ভর ক্রীতদাস ও মনিব, জায়গীরদার ও অধিরাজ, সাধারণ জন ও পুরোহিত। ব্যক্তিগত নির্ভরতা সামাজিক উৎপাদনী সম্পর্ক-নির্ধারিত; অন্য জীবন যাত্রাতেও  উৎপাদন এভাবেই সংগঠিত হয়।২১ এবং তিনি উতপাদনী পণ্য বিনিময়ের উৎপত্তি যাচাই করার সময় দেখেছেন যে বিভিন্ন পরিবার, আদিবাসী ধারা প্রভৃতির মধ্যে  সংযোগ গড়ে উঠেছিল, ‘কারণ সভ্যতার সূচনায় ব্যক্তি নয় , স্বয়ম্ভরতা-ভিত্তিতে পরিবার ও আদিবাসী সমস্টির মধ্যে সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।।২২ এভাবেই সগোত্রতার আদিম বন্ধন বা  মধ্যযুগীয় প্রভু ও জায়গীরসারদের যোগসাজসের অধীনতায় ‘সীমিত উৎপাদন সম্পর্কের’ (bornirter Productionsverhältnisse) সঙ্গে  ব্যক্তিজীবন একে অন্যের সঙ্গে পারস্পরিক সম্পর্কে  জড়িয়ে ছিল।২৩                    
ধ্রুপদী অর্থ শাস্ত্রবিদেরা এই বাস্তবতাকে উল্টোভাবে দেখেছেন। প্রাকৃতিক বিধিগুলির প্রেরণাদায়ক এই ভাবনাকে মার্ক্স কল্পনাসর্বস্ব মনে করতেন । বিশেষত অ্যাডাম স্মিথ প্রসঙ্গে, যিনি মনে করতেন  আদিম পারিপার্শ্বিকতায় ব্যক্তির শুধু  পৃথক   অস্তিত্ব ছিল না,  সমাজের বাইরে থেকেও উৎপাদন করতে পারত। অরণ্য-শিকারী জনজাতি ও রাখালদের মধ্যে শ্রমবিভাগ ছিল,যারা তাদের জীবিকায় বিশিষ্টতা অর্জন। করত, কেউতীর-ধনুক তৈরির কাজে, কেউ বনের কাঠ দিয়ে কুটির বানানোয়, কেউ অস্ত্র তৈরিতে বা ছুতোরের কাজে  অতি দক্ষ      হয়ে উঠত।২৪ অতীত সমাজে অরণ্য শিকারী ও মৎস্যজীবীদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ও শ্রম–সময়ের ভিত্তিতে পণ্য-বিক্রেতাদের মধ্যে বিনিময়ের তত্ত্বের  জন্য ডেভিড রিকার্ডোকেও অনুরূপভাবে কালবৈষম্যের জন্য সমালোচিত হতে হয়েছিল।২৫
এভাবেই স্মিথ ও রিকার্ডো তাঁদের কালে সমাজের অতি উন্নত ব্যষ্টির তথা বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি বুর্জোয়ার ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন যেন সে প্রকৃতির স্বতঃস্ফূর্ত উদ্ভাস। তাঁদের লেখায় উঠে এসেছে মিথস্ক্রিয়াভিত্তিক ও কালনিরপেক্ষ ব্যক্তি, প্রকৃতিপ্রদত্ত, যাদের সমাজ-সম্পর্ক অভিন্ন এবং যাদের অর্থনৈতিক আচরণ ইতিহাস-নিরপেক্ষ ও নৃতাত্বিক ।২৬ মার্ক্সের মতে প্রাচীন কাল থেকেই প্রতিটি নুতন ঐতিহাসিক যুগের ব্যাখ্যাতাগণ নিজেদের নিয়মমাফিক প্রতারিত করেছেন এভাবেই, যা তাঁদের যুগ বৈশিষ্ট্য।২৭
মার্ক্সের যুক্তি ‘সমাজের বাইরে বিচ্ছিন্ন ব্যক্তির উৎপাদন  ব্যক্তিদের বাদ দিয়ে  ভাষার বিকাশ ও সেইমতো ক্তহাবিনিময়ের মতো।২৮ আর যাঁরা অষ্টাদশ শতাব্দীতে বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিকে মানব প্রকৃতির আদিরূপ হিশেবে চিত্রিত করেছিলেন , তাঁদের খন্ডন করে বলেছিলেন ‘এটি ইতিহাসের ফলাফল, ইতিহাস-বিচ্যুতি। তিনি বলেছিলেন এমন ব্যক্তি হয়ে উঠতে পারে এক অতি উন্নত সামাজিক সম্পর্ক  বিকশিত হলেই।২৯ মার্ক্স এদের সাথে পুরোপুরি একমত হতে পারেন নি যে মানুষ রাজনৈতিক প্রাণী { ζώον πολιτικόν (zoon politikon)} , মানুষ সামাজিক প্রাণী। তিনি জোর দিয়ে বলেছিলেন ‘মানুষ এমন প্রানী যার  ব্যক্তিগত স্থান সমাজের মধ্যে।৩০   তাই যেহেতু নাগরিক সমাজ কেবল আধুনিক সমাজে গড়ে উঠতে পারে, এক দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে  পুঁজিতান্ত্রিক যুগে মুক্ত মজুরি-শ্রমিকের অভ্যুদয় হয়েছিল।সে একদিকে সমাজের সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার অবসানের ফল , অন্যদিকে ষোড়শ শতাব্দী থেকে উদ্ভিন্ন নূতন উৎপাদনী শক্তির প্রকাশ।৩১ মার্ক্স যদি কোনো বিষয় পুনরাবৃত্তি করে থাকেন, তা সেই সময়ে দু-দশক কালে হেনরি চার্লস কেরি,ফ্রেদারিক বাস্তিয়া ও পিয়ের জোসেফ প্রুধোঁর উত্থিত বিতর্কের জবাবে। ৩২
পুঁজিতান্ত্রিক ব্যক্তির উদ্বর্তনের ছবি আঁকার পরে ও আধুনিক উৎপাদন ‘সামাজিক বিকাশের এক নির্দিষ্ট স্তর – সামাজিক ব্যষ্টিসমূহের উৎপাদন’ বর্ণিত করে মার্ক্স  অর্থশাস্ত্রবিদদের ‘সাধারণভাবে  উতপাদন’এর ধারণাকে (Production im Allgemeinem ) ঘুলিয়ে দেবার প্রবণতা উন্মোচিত করার জন্যে দ্বিতীয় ঔপপত্তিক প্রয়োজনীয়তার দিকের প্রশ্ন তুললেন। এ এক  উদ্ভট ধারণা, যার বাস্তবের  কোনো স্তরেই অস্তিত্ব নেই।
যদি বিমূর্তায়ন ঐতিহাসিক বাস্তবতার বৈশিষ্ট্যের সাথে একত্রিত না হ’ত উৎপাদন এক নির্দিষ্ট ও পৃথকীকৃত প্রপঞ্চ থেকে এক চিরকালীন স্বতঃ-অভিন্ন প্রক্রিয়ায় পরিবর্তিত হতে পারত না, যাতে বিভিন্ন রূপে প্রতিভাত হবার ‘মূলগত বৈচিত্র্য’(wesentliche Verschiedenheit) অনভিব্যক্ত থাকত। অর্থশাস্ত্রবিদেরা ‘ বিদ্যমান সামাজিক সম্পর্কের চিরন্তনতা ও সামঞ্জস্য প্রতিপন্ন করতে গিয়েই’ ভুল করেছেন।৩৩ তার বিপ্রতীপে, মার্ক্স বলেছিলেন প্রত্যেকটি সামাজিক-অর্থনৈতিক সম্পর্কের বিশেষ বৈচিত্র্যগুলি একে অন্য থেকে আলাদা করতে পারে,  যে বাস্তব সত্য তার বিকাশে উৎসাহ যোগায় ও পন্ডিতদের আসল ঐতিহাসিকতা অনুধাবনে সহায়তা দেয়।৩৪
যদিও উৎপাদনের সাধারণ উপাদানগুলির সংজ্ঞায়ন ‘অনেকবার ভেঙেছে ও নানা নির্ধারনে বিভক্ত হয়েছে’, ‘যার কিছু সর্বকালীন, কিছু কিছু কয়েকটি যুগে’ ঘটেছে, এগুলি অবশ্যই সর্বজনীন উপাদান-অংশ, প্রকৃতিজাত মানুষী শ্রম ও উপাদান।৩৫ কারণ কোন বিষয় স্থির করে  ও সেই মতো কাজের ভিত্তিতে উৎপাদন ব্যতিরেকে কোন উৎপাদন সম্ভব নয়। কিন্তু অর্থশাস্ত্রবিদেরা উৎপাদনের এক তৃতীয় শর্ত প্রবর্তিত করেছে, ‘আগে থেকে পণ্য জমিয়ে রাখা, যা আগে নিয়োজিত শ্রমিকদের উৎপন্ন, যা হ’ল পুঁজি।৩৬ এই শেষোক্তটির সমালোচনা মার্ক্সের কাছে জরুরী, যার মাধ্যমে তিনি অর্থশাস্ত্রবিদদের সীমাবদ্ধতা ব্যাখ্যা করতে পেরেছেন। এ থেকে তিনি প্রত্যয়িত হলেন উৎপাদন শ্রমিকের ভূমিকা বিনা অনুপলব্ধ। কেন না শ্রমিকের দু হাত ছাড়া অতীতের উৎপাদন মজুত সম্ভব নয়। আদিম মানুষও বারবার কেবল এভাবেই চালিত হয়েছে। অবশ্য্‌ পুঁজি যে অতীত শ্রমে গড়া এবং উৎপাদনের উপাদান, এটা মানলেও তা চিরদিনই ছিল  স্মিথ, রিকার্ডো ও জন স্টুয়ার্ট মিলের সঙ্গে  সেইখানে তাঁর মতানৈক্য।

এই ভ্রান্তির কারণ যদি ‘পুঁজিকে উৎপাদনের উপাদানের শারীরিক বৈশিষ্ট্য হিশেবে কেউ দেখে, আর তার অর্থনৈতিক রূপ বিচার না করতে পারে  , যা উৎপাদনের উপাদানকে পুঁজিতে রূপান্তরিত করে,৩৭ তাহলে সে ‘প্রকৃত পার্থক্যগুলি অনুধাবনে ডাঁহা ফেল’ করবে ও ‘ভাববে যে একটি মাত্র অর্থনৈতিক সম্পর্ক নানা নামে বিদ্যমান। ৩৮
তা বিশ্বাসযোগ্য করতে  অর্থশাস্ত্রবিদেরা পুঁজিতান্ত্রিক উৎপাদন প্রণালীর জন্মের আগেই  তার ‘ফলাফল-এর বিদ্যমানতা’ ও তার বৈশিষ্ট্যগুলির ঐতিহাসিক পরিস্থিতি বর্ণনা করেছিলেন।৩৮ মার্ক্স গ্রুন্দ্রিসি-তে লিখেছেনঃ” বুর্জোয়া অর্থশাস্ত্রবিদেরা পুঁজিকে উৎপাদনের চিরন্তন ও প্রাকৃতিক ( ঐতিহাসিক নয়) রূপ মনে করে ও তৎকালীন রূপায়নের জন্য তার পরে তার শর্ত গুলি সূত্রায়িত করেবিধিবদ্ধ করতে চায় অর্থাৎ পুঁজিবাদী যেন তখন আত্মসাৎকরণ করছে না , কারণ পুঁজিবাদী হয়ে উঠছে ও তখনও   আত্মসাৎকরণ-সমর্থ নয়। ৪০           
মার্ক্সের মতে ঐতিহাসিক দিক থেকে, তাঁর সঙ্গে ধ্রুপদী অর্থশাস্ত্রবিদদের গভীর পার্থক্য এই যে ‘পুঁজি বিশ্বের সূচনা শুরু করে নি , বিদ্যমান উৎপাদন ও উৎপন্ন দ্রব্যের  মোকাবিলা করে ছিল যতদিন সেই প্রক্রিয়ার মধ্যেই তা পদানত করেছিল।৪১ কেন না ‘নতুন উৎপাদনী শক্তি ও সম্পর্ক শূন্য থেকে গড়ে ওঠে নি , আকাশ থেকে পড়েনি বা স্ব-স্থিরীকৃত জরায়ু থেকে জন্মায় নি। এসেছে ভিতর থেকে বিদ্যমান উৎপাদন বিকাশ এবং উত্তরাধিকার ও সাবেকী সম্পত্তিগত সম্পর্কের বৈপরীত্য থেকে।৪২ অনুরূপভাবে, যদি উৎপাদনকারীরা  উৎপাদনী উপায় থেকে বিচ্ছিন্ন হবার অবস্থায় আসে যা পুঁজিতন্ত্রীকে সম্পত্তিহীন শ্রমিক অন্বেষণ করতে দেয় যারা বিমূর্ত শ্রমদান করতে পারে( পুঁজি ও মূর্ত শ্রমিক বিনিময়ের আবশ্যিক শর্ত), সে প্রক্রিয়া সম্পর্কে অর্থশাস্ত্রবিদেরা নীরব অথচ সেই প্রক্রিয়াই পুঁজি ও মজুরী শ্রমিকের ঐতিহাসিক উৎস।৪৩
গ্রুন্দ্রিসি একাধিক অনুচ্ছেদে অর্থশাস্ত্রবিদদের ইতিহাসগত বাস্তবতাকে প্রাকৃতিক বাস্তবতা হিশেবে চিত্রিত করা সমালোচিত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, মার্ক্সের কাছে এটা স্পস্ট ছিল যে টাকা ইতিহাসের সৃষ্টি।৪৪ ঋণও তাই। মার্ক্সের মতে ঋণ দেওয়া ও নেওয়া অতীতের অনেক সভ্যতায় ছিল, যেমন ছিল সুদের কারবার।কিন্তু ‘কেবল ঋণ ব্যতিরেকে অন্য কিছু নয়;  শিল্প শ্রমিক ও মজুরীহীন শ্রমিক নিয়োজন নয়।  এবং উৎপাদনের উন্নত সম্পর্কে ঋণ ইতিহাসগতভাবে আবশ্যিক হয়ে ওঠে পূঁজির সঞ্চালনে।৪৫ মূল্য ও বিনিময় প্রাচীন সমাজেও ছিল।কিন্তু  উৎপাদন পরিব্যয়ে প্রথমোক্ত ক্রমবর্ধমানরূপে নির্ণায়ক হওয়া ও শেষোক্ত উৎপাদনের যাবতীয় সম্পর্কে ক্রমবর্ধমান আধিপত্যের দরূণ বুর্জোয়া সমাজ ও অবাধ প্রতি্যোগিতার  পূর্ণ বিকাশ হতে পেরেছে ‘ বা ‘যা ঊনবিংশ শতাব্দীতে অ্যাডাম স্মিথ প্রাক-ঐতিহাসিক কালে তুলে ধরেছিলেন, ইতিহাসের আগে, বরং ইতিহাসের  ফল হিশেবে।৪৬ উপরন্তু ইতিহাস চেতনায় খামতির জন্য মার্ক্স যেমন অর্থশাস্ত্রবিদদের সমালোচনা করেছিলেন, তেমন প্রুধোঁ ও অন্যান্য সোশ্যালিস্টদের ব্যঙ্গ করেছিলেন, কারণ এরা ভাবতেন বিনিময় মূল্য শ্রম মজুরি শ্রমিকে রূপান্তরিত না হলে নিরস্তিত্ব অথবা পুঁজিতন্ত্রীদের বাদ দিয়েও পুঁজি উদ্ভুত হতে পারে।৪৭
মার্ক্সের মূল লক্ষ্য ছিল পুঁজিতান্ত্রিক উৎপাদনী উপায়ের ঐতিহাসিক স্বাতন্ত্র্য  সপ্রত্যয়ে দর্শানো, যা তিনি ‘পূঁজি’র তৃতীয় খন্ডে পুনরুক্তি করেছেন- ‘এটা উৎপাদনের পরম পদ্ধতি নয়’ , শুধুমাত্র ঐতিহাসিক, নশ্বর।৪৮
এই অভিমত থেকে শ্রম পদ্ধতি সহ অন্যান্য বিশিষ্টতাকে নানা ভাবে বিচার করা যায়।গ্রুন্দ্রিসি-তে মার্ক্স লিখেছেন, “ বুর্জোয়া অর্থশাস্ত্রবিদেরা সামাজিক বিকাশের কোনো নির্দিষ্ট স্তরীয় ধারণায় এত মজে থাকে যে সামাজিক শ্রম অবনতিকরণের ক্ষমতা অর্জনের আবশ্যিকতা এদের কাছে তাদের বিযুক্তি করণের আবশ্যিকতা থেকে অবিচ্ছিন্ন।৪৯ পূঁজিতান্ত্রিক উৎপাদন পদ্ধতির কথা উত্থাপনে  মার্ক্স এই প্রসঙ্গ বারবার এনেছেন, যেন তারা উৎপাদন পদ্ধতির ধ্রুবক। মজুরী শ্রমকে কোনো ইতিহাসগত রূপের সুস্পস্ট সম্পর্ক না ভেবে শুধু মানুষের অর্থনৈতিক অস্তিত্বের সর্বজনীন বাস্তবতা হিশেবে মান্য করার অর্থ শোষণ ও বিযুক্তি চিরদিন ছিল, ভবিষ্যতেও থাকবে এমন ধারনা প্রচার।
পূঁজিতান্ত্রিক উৎপাদনের নির্দিষ্টতাকে পাশ কাটিয়ে চলার পরিণাম  জ্ঞানতত্বগত ও রাজনৈতিক উভয়তই।এক, উৎপাদনের বাস্তব  ঐতিহাসিক স্তরগুলি উপলব্ধির অন্তরায়। দুই, বর্তমান পরিস্থিতিকে অপরিবর্তিত ও অপরিবর্তনীয় সংজ্ঞায়নের ভিত্তিতে সাধারণভাবে পুঁজিতান্ত্রিক উৎপাদন ও বুর্জোয়া সামাজিক সম্পর্ককে প্রাকৃতিক-মানবিক সম্পর্ক হিশেবে ব্যাখ্যা। সেই অনুসারে মার্ক্স-এর  অর্থশাস্ত্রবিদদের সমালোচনার দ্বিবিধ মূল্য ছিল। বাস্তবতা অনুধাবনে  যেমন অপরিহার্য ছিল ইতিহাসগত বৈশিষ্ট্য লিপিবদ্ধকরণ, তেমনই পূঁজিতান্ত্রিক উৎপাদন প্রণালীর অপরিবর্তনীয়, এই মতান্ধতা মোকাবিলা করার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সম্পর্কে যাথার্থ্য। পূঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার ঐতিহাসিকতা তুলে ধরাও এর নশ্বর চরিত্র  ও অবসান সম্ভাবনার প্রমানস্বরূপ হয়ে উঠবে।         
৩। লন্ডনে দারিদ্র্য-অভিজ্ঞতা
তাঁর অতিকায় প্রকল্প রূপায়নে শক্তি সঞ্চয়ের জন্য মার্ক্সের দরকার ছিল প্রশান্তি, কিন্তু তাঁর ব্যক্তিগত জীবন অত্যন্ত দুর্বিসহ তথা নিরাপত্তাবিহীন এবং তা এতটাই যে তাঁকে আদৌ স্বস্তি দিচ্ছিল না। তাঁর নতুন বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে গিয়ে সব সংস্থান নিঃশেষিত হওয়ায় প্রথম মাসের ভাড়া দেবার সঙ্গতি ছিল না। সেই সময় এঙ্গেলস ম্যাঞ্চেস্টারে বসবাস ও কর্মরত থাকায় তাঁকে তাঁর দুরবস্থার কথা জানালেনঃ “ক্রমবর্ধমান পারিবারিক দায় মেটানোর আশা দেখছি না। কি যে করি ভেবে পাচ্ছি না এবং পাঁচ বছর আগেও এতটা আশাহত ছিল না। ভাবছিলাম আমি কর্দমাক্ত অভিজ্ঞতার স্বাদ আগেই পেয়েছি। কিন্তু তা নয়।৫০ মার্ক্সের সেই ব্যথিত উক্তি এঙ্গেলস-এর কাছে গভীর বেদনাদায়ক, কারণ তিনি ভেবেছিলেন তাঁর প্রিয় সখা স্থিতু হবেন। এই ভেবেই বড়দিনের সময় এঙ্গেলস  তাঁর বাবার কাছ থেকে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে  ১৮৫৭-র জানুয়ারীতে একটা ঘোড়া কিনেছিলেন। ঘোড়ায় চড়ে শেয়াল শিকার করা তাঁর বড় শখ ছিল। কিন্তু  সেই সময়ে ও সারা জীবন মার্ক্স ও তাঁর পরিবারকে আর্থিক সাহায্য দিতে কখনো কার্পণ্য করেন নি। মার্ক্সের কাতর বার্তা পেয়ে মার্ক্স-কে প্রতি মাসে ৫ স্টার্লিং পাউন্ড  পাঠানো শুরু করলেন এবং সনির্বন্ধভাবে জানালেন তাঁর কঠিন সময়ে মার্ক্স তাঁর উপর যেন সদাই আস্থা রাখেন।

এঙ্গেলসের ভূমিকা কেবল আর্থিক সমর্থনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। সেই কালপর্বে মার্ক্স যখন গভীর বিচ্ছিন্নতায়, তিনি কেবল এঙ্গেলসের সঙ্গেই বৌদ্ধিক মতবিনিময় করতেন, “ তোমার অভিমতের চেয়ে বড় কিছু আমার চাওয়ার নেই।৫১  নৈরাশ্যের দুরূহ সময়ে এঙ্গেলসই একমাত্র সখা যার কাছে কোন কিছু গোপন করতেন না। ‘শিগগির জবাব দিও কারণ তোমার চিঠিগুলো আমাকে চাঙ্গা করে তোলে।’ ৫২  ঘটনাপ্রবাহ সকৌতুকে মন্তব্যেও তাঁর সাগরেদ এঙ্গেলস।একবার যেমন ব্যঙ্গের সাথে বলেছিলেন, “ যারা ডিগবাজি খেতে পারে, আমি তাদের ঈর্ষা করি।ক্রোধ ও শারীরিক বর্জ্য  থেকে রেহাই পেতে বুর্জোয়া কর্তাদের এটাই বড় উপায়।৫৩
বস্তুত, অচিরেই অনিশ্চয়তা আরো দুঃসহ হয়ে উঠল। এঙ্গেলস থেকে অনুদান ছাড়া মার্ক্সের আয় বলতে ছিল ন্যু ইয়র্ক ট্রিবিউন থেকে লেখা থেকে রোজগার। সেই সময় সবচেয়ে বেশী প্রচারিত ইংরেজী ভাষার পত্রিকা। শর্ত ছিল প্রতি লেখার জন্ত ২ স্টার্লিং পাউন্ড পাবেন। অর্থনৈতিক সংকটের প্রভাব পড়েছিল ঐ পত্রিকার উপরও । মার্ক্সের লেখাও কমে এলো। সেখানে তিনি ছাড়া ইয়োরোপীয় সংবাদদাতা হিশেবে  নিয়মিত লিখতেন লেখক ও ভ্রমনকারী  ব্রেয়ার্ড টেলর (১৮২৫-১৮৭৮)। তাঁকে ছাঁটাই করা হ’ল না, কিন্তু মার্ক্সের লেখা সপ্তায় দুটো থেকে একটা হ’ল। সাম্মানিক অর্ধেক হয়ে গেল। সখেদে লিখেছিলেন, “অবশ্য রমরমার সময়েও ওরা আমাকে এক কপর্দক বেশী দিত না।”৫৪ সকৌতুকে লিখেছিলেন, “নিয়তির এমন পরিহাস যে, এই সব অভিশপ্ত সংকটে ব্যক্তিগতভাবে আমিই সংসক্ত হয়ে পড়ি।৫৫ অবশ্য আর্থিক বিপর্যয় পরখ করতে পারাও এক অতুলনীয় উপভোগ। “ যে পুঁজিতন্ত্রীরা  ‘কাজের অধিকার’এর বিরুদ্ধে এত সরব ছিল তারাই সর্বত্র জনগণের অর্থ থেকেই সরকারের কাছে ‘মুনাফার অধিকার’তে জনসমর্থন পেতে ঘুরে বেড়াচ্ছে, দেখে মজা পাচ্ছি।৫৬  উদ্বেগ সত্বেও, এঙ্গেলসকে জানালেন, ‘যদিও ১৮৪৯ সাল থেকে আমার অর্থনৈতিক দুর্দশা দুর্বিসহ এই সংকটের বিস্ফোরণে উপভোগ করছি । ৫৭   
এক এক নতুন সম্পাদকীয় প্রকল্প কিছুটা লাঘব করল তাঁর নৈরাশ্য। ন্যু ইয়র্ক টাইমস=এর সম্পাদক চার্লস ডানা (১৮১৯-৯৭) মার্ক্স-কে নিউ আমেরিকান সাইক্লোপিডিয়ার সম্পাদকীয় কমিটিতে যোগ দেবার আহ্বান জানালেন। অর্থাভাবে সেই প্রস্তাব গ্রহণ করলেন, কিন্তু কাজের সিংহভাগ এঙ্গেলসকে ন্যস্ত করলেন যাতে তিনি গবেষণার কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখতে পারেন। তাঁরা দুজনে জুলাই ১৮৫৭ ও নভেম্বর ১৮৬০ সময়পর্বে নিজেদের কাহ ভাগ করে নিলেন। এঙ্গেলস সামরিক বিষয়ক অর্থাৎ কারা কারা সামরিক অফিসার হলেন , তা নথিবদ্ধকরণ আর মার্ক্স জীবনবৃত্তান্ত লিপিবদ্ধ করণের কাজ করলেন। যদিও পৃষ্ঠা পিছু ২ ডলার বড্ড কম ছিল,  আর্থিক বিপর্যয় মোকাবিলায় তা সহায়ক হয়ে উঠেছিল।এ কারণে ডানাকে এঙ্গেলস আর্জি জানিয়েছিলেন যত অধিক সম্ভব তত সংখ্যক নথি (এন্ট্রি) পাঠাতে। “আমরা অনায়াসে ‘নিখাদ’ জ্ঞানগত তথ্য সরবরাহ করতে পারি যতক্ষণ তার বিনিময়ে ক্যালিফর্নিয়ার নিখাদ সোনা পাবো।৫৮ মার্ক্স লেখার ব্যাপারে যে নীতি অনুসরণ করতেন, এখানেও তাই করলেন – “যতটা সংক্ষেপ করা সম্ভব ততটাই, যদিও তা বিরস।৫৯
এত চেস্টা সত্বেও মার্ক্সের অর্থকরী অবস্থার আদৌ উন্নতি হল না। কার্যত তা এতই  অস্থিতিশীল য়ে পড়েছিল মহাজনরা ‘ক্ষূধার্ত নেকড়ে’র মতো তাঁকে ধাওয়া করছিল ৬০ এবং  প্রবল শৈত্যে বাসস্থান উষ্ণ থাকার জন্য জানুয়ারী ১৮৫৮য় কয়লা না থাকায় এঙ্গেলসকে লিখলেনঃ “ এমন অবস্থা থাকলে অচিরে  আমি মাটির নীচে মাইল মাইল নিম্নগামী হতে থাকব ।সব সময় অন্যদের কাছে উপহাস হয়ে থাকা ও তার উপর পরিণামে  একই সঙ্গে ব্যক্তিগত খুঁটিনাটি দ্বারা কেবলই ছিন্নভিন্ন হচ্ছি।”৬১ এমন অবস্থায় আবেগের বশে অনেক কটুকথা তাঁর মুখে এসে পড়ছিল। “ একাকীত্বে আমার মনে হয় আমি এক অকল্পনীয় উত্তেজনাকর জীবনের মধ্যে পড়েছি... যে মানুষেরা উচ্চাশাপ্রবণ, তাদের বিয়ে করার মত নির্বুদ্ধিতা আর নেই, আর এ কারণে গার্হস্থ্য ও ব্যক্তিগত জীবনে ছোটখাটো দুরবস্থায় জড়িয়ে পড়ে।৬২
মার্ক্স কেবল দারিদ্র্যের ভূত-তাড়িত ছিলেন না। তাঁর কস্টকর বেঁচে-বততে থাকার লড়াই এর পাশাপাশি ছিল একই সময়ে একাধিক রোগভোগ।মার্চ ১৮৫৭য় নিশি জাগরণে অত্যধিক পরিশ্রমের দরুণ চক্ষু সংক্রমন, এপ্রিলে দাঁতে ব্যথা , মে মাসে যকৃতে ক্রমান্বিত অস্বস্তির জন্য তাঁকে ‘ভেষজ-নির্ভর’ করে তুলেছিল।
খুবই দুর্বল হয়ে পড়ার জন্য তিন সপ্তা কোন কাজ করতে পারেন নি। এঙ্গেলসকে জানালেন, “ যাতে আমার সময় নস্ট না হয়, আমি ড্যানিশ ভাষা ভালোভাবে রপ্ত করছি, এর থেকে ভালো কিছু করা যাচ্ছে না এখন।” বললেন, “ডাক্তারের আশ্বাস মত, পরের সপ্তায় স্বাভাবিক কাজকর্ম শুরু করতে পারবো।এখন আমি কুইন্সি ফলের মতো (নাসপাতি –সদৃশ-অনুবাদক) হলদে হয়ে গেছি, খুব বিরক্তিকর ঠেকছে।৬৩
কিছুদিন বাদেই মার্ক্স পরিবারে আরেক গভীর দুঃখ নেমে এলো। জুলাই-এর মার্ক্স-পত্নী ইয়েনি তাঁর শেষ শিশুর জন্ম দিলেন। সে এত ক্ষীণতনু  ছিল, যে প্রায় জন্মাবার সাথে সাথেই মারা গেল। আরো একবার শোকাহত মার্ক্স এঙ্গেলস-কে কবুল করলেন, “ এটা ঠিক ট্রাজেডি নয়, কিন্তু... এই রকম ঘটনা আরেক হৃদয়বিদারক স্মরিয়ে দিচ্ছে ( সম্ভবত পুত্র এডগারের স্মৃতি, এর আগে হারানো তাঁর শেষ সন্তান)। এই চিঠিতে আর কিছু লিখতে পারছি না।”৬৪ এঙ্গেলস ঐ কথায় খুব মুষড়ে পড়লেন, উত্তরে লিখলেন, “ এমন কঠিন  সময়ে তোমার পক্ষে কিছু লেখা খুব কস্টদায়ক। ছোট্ট শিশুর মৃত্যু তুমি নির্বিকারভাবে মেনেও নিতে পারো, কিন্তু তোমার স্ত্রী পারবে না।৬৫
সেই সময় এঙ্গেলস গ্রন্থিগত জ্বরে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ায় পরিস্থিতি আরো জটিল হল। গোটা গ্রীস্মকাল কোনো কাজই করতে পারলেন না।তখন মার্ক্স সত্যিই খুব সমস্যায় পড়লেন। তাঁর বন্ধু ছাড়া এনসাইক্লোপিডিয়ার কাজ ব্যাহত, কোন তথ্যই সন্নিবেশিত করতে পারছেন না। যেহেতু তাঁর তখন আরো সময় চাই, তিনি ভাণ করলেন যে ন্যু ইয়র্কে এক বান্ডিল পান্ডুলিপি পাঠিয়েছেন, কিন্তু সেগুলি যাত্রাপথে হারিয়ে গেছে। তবুও কাজের চাপ লাঘব হ’ল না। সেই সময়ে ভারতে সিপাহী বিদ্রোহ নিয়ে ন্যু ইয়র্ক তার কোন বিশেষজ্ঞের কাছ এক বিশ্লেষণী লেখার প্রত্যাশী ছিল,৬৬ কিন্তু জানত না যে সেই বিশেষজ্ঞ এঙ্গেলসই। সেই পরিস্থিতির চাপে মার্ক্স সাময়িকভাবে ‘সামরিক বিভাগ’এর দায়িত্ব পেলেন ৬৭ ও লিখলেন বর্ষা নেমে পড়ায় ইংরেজেরা পিছু হাটল। এঙ্গেলসকে লিখলেন, “হতেই পারে কাজটা আমার  পক্ষে দৃষ্টিকটূ, , কিন্তু কিছুটা দ্বান্দ্বিক উপায়ে তার সুরাহা করতে পারলাম। যথাযথ শব্দচয়ন দ্বারা আমি কোন না কোন দিক থেকে সূত্রায়ন করলাম।৬৮ যাই হোক, মার্ক্স ঐ লড়াইকে ছোট করে দেখেন নি, বলেছিলেন, “এতে ইংরেজদের লোকবল ও স্বর্ণসম্ভারের ক্ষতির ফলে এখন ভারত আমাদের সবচেয়ে বড় মিত্র। ৬৯           
দারিদ্র্য, স্বাস্থ্য সমস্যা ও নানা ট্রাজেডি-ক্লিষ্ট প্রেক্ষিতে মার্ক্স গ্রুন্দ্রিসি লিখেছিলেন।বুর্জোয়া প্রশান্তির মাঝে  কোনো সম্পন্ন.চিন্তাবিদের গবেষণা-লব্ধ গ্রন্থ নয়। পরন্তু এক দারিদ্র্য-ক্লিষ্ট লেখকের কাজ, যিনি প্রেরণা পেয়েছিলেন এক প্রত্যয় হতে যে অগ্রসরমান সংকটে তাঁর সময়ে এই কাজ শ্লাঘনীয় হবে।

৪। এক পদ্ধতির সন্ধানে    
মার্ক্স তখন পদ্ধতিগত প্রশ্ন উত্থাপন করলেন- কিভাবে তাঁর ভাবনা বাস্তবে রূপায়ন করবেন? কেমন করে সমাজকে বোঝা তার হয়ে একটি বিমূর্ত মডেল প্রণয়ন করবেন? গ্রুন্দ্রিসির ‘উপক্রমনিকা’য় এই প্রশ্নগুলি তুলে ধরা হয়েছিল। যে পৃষ্ঠাগুলিতে মার্ক্স ‘বৈজ্ঞানিক উপস্থাপনা ও মূর্ত আন্দোলনের সম্পর্ক’৭০ নিয়ে বলেছেন , তা পদ্ধতি সম্পর্কে তাঁর চূড়ান্ত ভাবনা নয়।সেখানে সমস্যার তত্বায়ন অসম্পূর্ণ ও একাধিক বিষয় ভাসা ভাসা ভাবে লেখা। তথাচ ‘উপক্রমনিকা’য় এই ভাবনাগুলি ঔপপত্তিক কথনে অপরিহার্য, মার্ক্সের তন্নিষ্ঠ ব্যাখাকার ও পাঠকদের কাছে সাহিত্যগত ভাবেও চিত্তাকর্ষক ।     
অতীতের মহান চিন্তাবিদদের পথ ধরে মার্ক্সও নিজের কাছে প্রশ্ন রাখলেন কোথা থেকে শুরু করবেন। তাই তাঁর বিশ্লেষণের বিষয়ের সূচনা  রাজনৈতিক অর্থনীতি বিচার। একটি সম্ভাবনা তা ‘মূর্ত ও বিমূর্ত এবং তার  বাস্তবিক পূর্ব শর্ত’ , তৎসহ অর্থনীতির সমগ্র সামাজিক প্রক্রিয়া ও জনসমষ্টিকে ভিত্তি ও বিষয় হিশেবে বিচার।৭১ কিন্তু মার্ক্স-এর কাছে  রাজনৈতিক অর্থনীতি তত্বের প্রতিষ্ঠাতা উইলিয়াম পেটি ( ১৬২৩-১৬৮৭) ও পিয়ের দ্য বোয়াগিলবে(১৬৪৬-১৭১৪)র পন্থা অপ্রতুল ও ভ্রমাত্মক প্রতিভাত হয়েছিল। জনসমষ্টির এমন  অনির্ণিত সত্তাকে ভিত্তি করে শুরু করলে সামগ্রিকতাভাবে জাতিবাচকতা আত্যন্তিক হয়ে উঠবে, বুর্জোয়া ও সর্বহারা দুই শ্রেণীর বিভাজন দেখাতে পারবে না, যে বিভাজন উপলব্ধ হয় তাদের স্ব স্ব গঠনমৌলিকতা – পুঁজি, ভূমিমালিকানা ও মজুরী শ্রমিক সম্পর্কে জ্ঞান। অভিজ্ঞতাভিত্তিক পদ্ধতি দ্বারা রাষ্ট্রসহ তাবৎ বাস্তবিক উপাদান শ্রম, অর্থ ও মূল্যের মত বিমূর্ত নির্ণায়কে দ্রবীভূত হবে।       
এরকম অভিজ্ঞতাভিত্তিক পদ্ধতিতেই রাষ্ট্রসহ তাবৎ মূর্ত  উপাদান শ্রম, অর্থ ও মূল্যের মত বিমূর্ত নির্ণায়কে দ্রবীভূত হবে।       
অষ্টাদশ শতাব্দীর অর্থশাস্ত্রবিদেরা তাঁদের বিমূর্ত বিভাগগুলির সংজ্ঞায়নের আগেই ‘ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা শুরু হয়ে গিয়েছিল, যা শ্রম, শ্রম বিভাগ, চাহিদা ও বিনিময় মূল্যের মত সরল সম্পর্কগুলি থেকেই অন্বিত হয়েছিল রাষ্ট্র  স্তরে , দেশগুলি ( অর্থাৎ জাতি-অনুবাদক) ও বিশ্ব বাজারের বিনিময়ের সঙ্গে। সেই পদ্ধতিই  অর্থনীতিতে প্রয়োগ করেছিলেন স্মিথ ও রিকার্ডো এবং দশনে গিয়র্গ হ্বিলহেইম ফ্রিডরিশ হেগেল , যার সারবস্তু তত্ব-বিধৃত করা যায় এইভাবে ‘বিমূর্ত নির্ণয় চিন্তার মাধ্যমে নিয়ে যায় মূর্তের  পুনরুৎপাদনে’, মার্ক্স যাকে ‘বিজ্ঞানগতভাবে নির্ভুল পদ্ধতি’ দ্বারা ব্যাখ্যা করেছিলেন (wissenschaftlich richtige Methode)। সেই সঠিক বিভাগকরণের মাধ্যমেই ‘একজন কোন জন সমষ্টির কাছে পোঁছানোর আগে অগ্রসর হতে পারে- সামগ্রিকতার বিশৃঙ্খল ধারনা নয়, অনেক নির্ণয় ও সম্পর্কের সমৃদ্ধ ধারণার মাধ্যমে।”৭২
তথাপি, ‘উপক্রমনিকা’ সম্পর্কে কিছু কিছু ভাষ্যকার যা লিখেছেন ৭৩  মার্ক্স তা বলেন নি,  তাঁর সংজ্ঞায়িত ‘বিজ্ঞানগত ভাবে নির্ভুল পদ্ধতি’ মার্ক্স নিজে পরে প্রয়োগ করেন নি।৭৪ প্রথমত, তিনি মানতেন না অর্থশাস্ত্রবিদদের  প্রত্যয় যে মূর্ত বাস্তব সম্পর্কে তাঁদের যৌক্তিক সিদ্ধান্ত বাস্তবের বিশ্বাসযোগ্য প্রতিফলন ৭৫। ‘উপক্রমনিকা’য় বর্ণিত পদ্ধতি সুসমন্বিতভাবে লিপিবদ্ধ আছে,কিন্তু তার মধ্যেও মৌলিক মতানৈক্য আছে। পূর্বসূরি হেগেলের মত, মার্ক্স স্থিরনিশ্চিত ছিলেন যে ‘ বিমূর্ত থেকে উত্থিত পদ্ধতিই মূর্ত বাস্তব চিন্তনের পথ’, ভাবনায় বাস্তবতার পুনর্গঠন সরলতম ও সাধারণতম নির্ণয়াদি থেকে শুরু হওয়া উচিৎ। কারণ ‘অনেক নির্ণয়ের ঘনীভবন’ই মূর্ত বাস্তব। তাই চিন্তনে বৈচিত্র্যের ঐক্য ‘ঘনীভবনের পদ্ধতি’ এবং ফলত বহির্গমনের পথ’ নয়, যদিও মার্ক্সের কাছে এটা মনে রাখা দরকার ছিল যে, ‘ পর্যবেক্ষণ (Anschauung) ও বোঝার জন্য বহির্গমনের পথ’ মূর্ত বাস্তব।
অভিন্ন বৌদ্ধিক মিল সত্বেও, হেগেল-এর সঙ্গে মার্ক্সের পার্থক্যও ছিল। ‘হেগেল-এর বিভ্রম ছিল বস্তুত কে চিন্তার ফসল মনে করা’।অন্যদিকে ‘ মার্ক্স কখনোই ভাবতেন না এটা এভাবে মূর্ত বাস্তব এমন কোন  প্রক্রিয়া-সঞ্জাত হতে পারে।’ মার্ক্স-এর অভিমত, হেগেলীয় ভাববাদে ‘বিভাগ গুলির গতি আপাতচোখে  উৎপাদনের বস্তুগত কর্ম... বিশ্ব যার প্রতিফল’ ; “ মানুষই প্রকৃত  চিন্তন-ধারণা-উদ্ভুত’,  বস্তুগত দুনিয়ায় যা শুধু তার প্রতিফলন নয়, সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার প্রচালকও। হেগেলের এই ভাবনার বিরুদ্ধতা মার্ক্স বার বার দৃঢ়ভাবে প্রকাশ করে বলেছেন, “ মূর্ত সামগ্রিকতাকে চিন্তার সামগ্রিকতা (যথা) বাস্তব চিন্তা আসলে চিন্তন ও অনুধাবনের ফসল”, কিন্তু তা “কোন মতেই চিন্তন অভিধার ফসল নয়, না তা নির্মাণ করতে পারে”, কেন না “মূল বস্তু তার স্বীয় অস্তিত্ব মস্তিষ্কের বাইরে অটুট রাখে আগের মতই...,তাই ঔপপত্তিক পদ্ধতি, বস্তু, সমাজ যে প্রাক-ধারণা, তা মনে রাখতে হবে।৭৬

‘উপক্রমনিকা’য় মার্ক্স আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দিকে দৃষ্টিনিক্ষেপ করেছেন। বিভাজনগুলির বিন্যাস কিভাবে করে লেখা শুরু করবেন? জটিল বিষয়গুলি প্রক্রিয়াগতভাবে সরল করবেন, নাকি তার বিপরীত পথ অনুসরণ করবেন?
বুর্জোয়া সমাজ  উৎপাদনের জটিলতম ঐতিহাসিক গঠন। এর বিভাজন-প্রকৃতিতে অভিব্যক্ত হয় তার সম্পর্কগুলি, কাঠামোগত ধী এবং সেহেতু সেই কাঠামো, উৎপাদন-সম্পর্কগুলি ও ধরাশায়ী সামাজিক গঠনগুলির প্রতি অন্তর্দৃষ্টিপাত করা যায়, যে ধ্বংসাবশেষগুলি ও উপাদানগুলি তারই গড়া এবং যার অংশবিশেষ পরাভূত না  হবার কারণে বাহিত হতে থাকে। ৭৭
তাই বিদ্যমানকে অতীত-পুননির্মাণের সুযোগের ইঙ্গিতও দেয়।“মানুষের শারীরস্থান বানরের শারীরস্থান (...এবং)নিম্ন তর অনুক্রমিক প্রাণীদের উত্তরণ  সম্পর্কে তথ্য জানা যায় উত্তরণ সম্পর্কে অবহিত হবার পরে” ।৭৮ এই বহুপঠিত বিবৃতি কিন্তু বিবর্তনের দৃষ্টিকোন থেকে দেখা অনুচিত। মার্ক্স সুস্পষ্ট ভাষায় ‘তথাকথিত ঐতিহাসিক বিবর্তন’ ধারণারই সমালোচনা করেছেন, কারণ ‘সাম্প্রতিকতম রূপ পূর্বস্তরগুলির অগ্রগতি’ মার্ক্সের মতে পল্লবগ্রাহিতা।৭৯ বিবর্তন-তাত্বিকদের উপস্থাপিত সরল থেকে জটিলে জৈব উত্তরণের অতিসরল প্রগতি পথ-এর বিপ্রতীপে এক জটিলতর অথচ যৌক্তিক পদ্ধতি চয়ন করেছিলেন এবং উৎপাদনী পদ্ধতি পরম্পরার ( প্রাচীন, এশীয়, সামন্ততান্ত্রিক, পুঁজিতান্ত্রিক) ইতিহাসের এক পৃথক তত্ত্ব তুলে ধরেছিলেন,যাতে নানা পদ্ধতির ভিতরে অনুমিত বিভাগ গুলির অবস্থান ও কর্মকান্ড ব্যাখ্যাত হতে পারে।৮০  সেটা বুর্জোয়া সমাজ যা, সেহেতু, পূর্ববর্তী ঐতিহাসিক যুগগুলির অর্থনীতি ধারণার সংকেত দেয়, যদিও নানা সমাজের মধ্যে গভীর পার্থক্য ছিল ও তাই সংকেতগুলি সংযমনে ব্যবহার্য । মার্ক্স বারবার জোর দিয়ে বলেছেন যে ‘অর্থশাস্ত্রবিদদের মত ইতিহাসগত পার্থক্যগুলি মুছে শুধু সমাজের তাবৎ রূপসমূহের বুর্জোয়া সম্পর্ক দেখলে হবে না।৮১
মার্ক্স ‘দারিদ্র্যের দর্শন’- অনুসৃত  বিজ্ঞানগত বিভাগগুলির কালানুক্রমিক পদ্ধতি নাকচ করেছিলেন, পরিবর্তে অনুসরণ করেছিলেন ইতিহাসগত ও অভিজ্ঞতাভিত্তিক অর্জিত জ্ঞান-এর মাধ্যমে যাচাই।যেহেতু বর্তমান অতীতকে  বা মানুষের গঠনের সঙ্গে বানরের গঠন অনুধাবনে সহায়ক, সবচেয়ে পরিণত স্তর তথা পুঁজিতান্ত্রিক সমাজকে অনুধাবনের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন ছিল, বিশেষত যে উপাদান সবচেয়ে বেশী প্রাধান্যময়।‘পুঁজিই বুর্জোয়া সমাজের সবচেয়ে প্রভাবশালী অর্থনৈতিক শক্তি, তাই শেষ থেকেই শুরু হয়’।৮২
বস্তুত, বিভাগ গুলিকে যথাযথ ক্রমবিন্যাস ও প্রকৃত ইতিহাসের গতিক্রিয়ার মধ্যে পারস্পরিক সংঘাত ঘটেনা। তাছাড়া মার্ক্স ‘পুঁজি’র পান্ডুলিপিতে লিখেছেন, ‘বাহ্যিক রূপ ও বস্তুর সারমর্মে সরাসরি সংঘাত সব বিজ্ঞানই আত্যন্তিক হয়ে ওঠে।” ৮৩
মার্ক্স তাই সাবেকী অর্থশাস্ত্রবিদদের নিজের প্রয়োগবাদ ছেড়ে স্বকীয় সংশ্লেষণে উপনীত হলেন,  যা ধ্রুপদী অর্থশাস্ত্রবিদদের পদ্ধতি থেকে  বস্তুগত উপাদানগুলি বিমূর্ত সংজ্ঞায়নে দ্রবীভূত হতে পারল, যা হেগেলের দর্শনসহদার্শনিক ভাববাদ থেকে মার্ক্স-ভাবিত  বাস্তবের চিন্তাকে বাস্তবিকতার মধ্যেই সীমিত করেছিল; জ্ঞান তাত্বিক ধারণা ( যা চিন্তার রূপগুলি ও বিষয়গত বাস্তবতা একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড় করায়) থেকে, ঐতিহাসিকতা থেকে ও ইতিহাসে যৌক্তিকতার দ্রবণ এবং শেষত ‘দারিদ্র্যের দর্শন’-এ তাঁর ব্যাখ্যা যে তিনি ‘ইতিহাসের গতিপথ’এ হাঁটছেন, এটাই মার্ক্সের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল।৮৪ মূর্ত বাস্তব ও চিন্তার মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় অনীহা তাঁকে দুয়ের মধ্যে ফারাক আছে তা প্রতিপন্নতামুখী করে- শেষোক্তটির বৈশেষিকতা চিহ্নিত করেন ও প্রথমোক্তকে চিন্তার স্বাতন্ত্র্য ন্যস্ত করেন- যাতে প্রকৃত ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার সম্পর্কগুলি যেভাবে প্রক্ষেপিত হয় , তা  বিভাগগুলির মুক্ত বিকাশের বিন্যাস থেকে ভিন্ন হয়।৮৫ ইতিহাসের স্তরগুলি শুধুমাত্র পুনরাবৃত্তিতে জ্ঞানগত প্রক্রিয়ার সীমিতকরণ এড়াতে, বিমূর্তকরনের প্রক্রিয়া প্রয়োগের প্রয়োজন ছিল এবং জটিলতাগুলি-সমেত সমাজের ব্যাখ্যার জন্য বিভাগগুলি করা হয়েছিল। অন্যদিকে, প্রকৃতই উপযোগী করার জন্য, সবসময় ঐতিহাসিক বাস্তবতার সঙ্গে বিমূর্তকরণের  এমনভাবে তুলনা করা হত যাতে সাধারণ যৌক্তিক নির্ণয়গুলি বাস্তব ঐতিহাসিক বাস্তবতা থেকে আলাদা করা যায়। এভাবেই মার্ক্সের ইতিহাস-ধারণা বলীয়ান হয়েছে ও গভীরতা অর্জন করেছে- একবার যুক্তি বিন্যাস ও প্রকৃত ঐতিহাসিক পারম্পর্য প্রতিসাম্য প্রতিষ্ঠা  হলে ইতিহাস বাস্তবতা উপলব্ধির ক্ষেত্রে নির্ধারক হয়ে ওঠে আর যৌক্তিকতা ইতিহাসকে নিছক ঘটনাপ্রবাহ থেকে অন্যতরভাবে ধারণাগঠন সম্ভব করে।৮৬
মার্ক্স-উদ্ভাবিত পদ্ধতি তাঁকে কেবল ইতিহাসে কিভাবে বিভিন্ন উৎপাদন প্রণালী প্রতিভাত হয়েছে তাদের  মধ্যে পার্থক্য বোঝার সরঞ্জাম দেয় নি, নূতন উৎপাদন প্রণালীর প্রবণতা পূর্বাহ্ন-কল্পনা অনুমানে সহায়ক এবং সেজন্যেই যারা ঘোষণা করেছিল পুঁজিতন্ত্র শ্বাশ্বত, তাদের হতবুদ্ধি করেছিল। জ্ঞানতত্ব সহ মার্ক্সের নিজের গবেষনা শুধুমাত্র ঔপপত্তিকতা-সর্বস্ব ছিল না। পরন্তু রাজনৈতিক সংগ্রামে নিবিড়তরভাবে নিয়োজনের লক্ষ্যে বিশ্ব প্রক্রিয়া  ব্যাখ্যার দায়বদ্ধতা-প্রচালিত ছিল।
এ প্রসঙ্গে মার্ক্সের শেষ প্রণিধানযোগ্য  লেখা গ্রীক শিল্পকলার সাথে আধুনিক সমাজের সম্পর্ক নিয়ে ভাবনা, যাতে তিনি ‘বস্তুগত উৎপাদন ও শিল্পকলার বিকাশের অসম সম্পর্ক’-এর উপর দৃষ্টিপাত করেছেন (ungleiche Verhältniß)।৮৭ পরবর্তী কালে ছদ্ম-মার্ক্সবাদীদের  উৎপাদন ও চেতনা-রূপের মধ্যে সেন একরকম অনমনীয় সমান্তরালবাদ বিদ্যমান, এমন ধারণা তো দূরস্থান, মার্ক্স জোরের সাথেই বলেছিলেন যে আর্থ-সামাজিক বিকাশ ও শিল্পকলা উৎপাদনের মধ্যে কোন প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেই।
লেনার্দ সিমঁদ দ্য সিসমঁদির (১৭৭৩-১৮৪২) দি হিস্টরিকাল ভিউ অফ দি লিটারেচার অফ দি সাউথ ইয়োরোপ-এর কিছু কিছু ধারণা পুনর্লিখনের সময় মার্ক্স( সেটা পড়েছিলাম ও খাতাপত্র ১৮৫২-তে উদ্ধৃত করেছিলেন ) লিখলেনঃ “ এটা সুবিদিত, সমাজের সাধারণ বিকাশে শিল্পকলা ক্ষেত্রের কোন কোন কালপর্ব মাত্রাতিরিক্তভাবে কুসুমিত হয়, গঠনরূপের বস্তুগত ভিতেও (materiellen Grundlage) তথা  অন্তর্কাঠামোতেও। তিনি বলেছিলেন কিছু কিছু শিল্পকলারূপ (যেমন মহাকাব্য) শিল্পকলা বিকাশের অনুন্নত স্তরেই সম্ভব। কলাক্ষেত্রে  বিভিন্ন প্রকারের শিল্পকলার আন্তর্সম্পর্কে যদি  তাই ঘটে থাকে, তাহলে সমাজের সাধারণ বিকাশের সামগ্রিক ক্ষেত্রে এই সম্পর্ক তো তেমন জটিল নয়।৮৮ গ্রীক শিল্পকলার আগে এসেছে গ্রীক পুরাকথা, যা সমাজ রূপের এক  ‘চেতনা-বহির্ভূত’ প্রতিভাস । কিন্তু আধুনিক যুগের মত উন্নত সমাজে মানুষ পরিপার্শ্বকে যুক্তির ভিত্তিতে বিচার করে, বাহ্যিক শক্তির মাধ্যমে নয়, এ যুগে পুরাকথা নিরস্তিত্ব,এখন মহাকাব্য আর রচিত হয়না ‘এখন কি আর পাউডার ও শিসা সহ অ্যাকিলাস সম্ভব? বা ইলিয়াডকে ছাপাখানায় ভাবা যায়...? ছাপাখানার পাতে কি গীতিকবিতা, কাহিনী কবির  শেষ গন্তব্যস্থল? আর তাই মহাকাব্যের কবিতার পরিপার্শ্ব কি উবে যাবেই?৮৯
বস্তুগত উৎপাদনের রূপগুলি কিভাবে বুদ্ধিগত সৃজনশীলতা ও আচরণের সঙ্গে মার্ক্সের অন্বিত হতে পারে এব্যাপারে মার্ক্সের দৃষ্টিকোন গোঁড়ামি-রহিত ছিল। এগুলির ‘অসম বিকাশ’ সম্পর্কে অবহিত হওয়ায় তিনি ছকে-বাঁধা মনোভাব নাকচ করেছিলেন, কারণ তা সামাজিক সমগ্রতার নানা চত্বরে অভিন্ন স ম্পর্ক আরোপিত করে।৯০ এমনকি দু’বছর আগে প্রকাশিত সুবিখ্যাত ‘আ কন্ট্রিব্যুশ্যন টু দি ক্রিটিক অফ ক্রিটিকাল একনমি’ থিসিসের ভূমিকায় মার্ক্স লিখেছিলেন,বস্তু জীবনের উৎপাদন পদ্ধতিই সামাজিক, রাজনৈতিক ও বৌদ্ধিক জীবনের সাধারণ প্রক্রিয়ার পরিপার্শ্ব তৈরি করে ৯১- যাকে নিয়তিবাদের ছাঁচে ব্যাখ্যা অনুচিত, ৯২  ‘মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ’-এর সংকীর্ণ ও পূর্ব-নির্ধারিত পথেও নয়, যা ‘মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ’) শুধু  সমাজের উপরিকাঠামোগত ঘটনাপ্রবাহ নরনারীদের বস্তুগত অস্তিত্বের প্রতিফলনে সীমাবদ্ধ।৯৩      ।  
‘উপক্রমনিকা’য় পদ্ধতিগত ভাবনার পাশাপাশি গ্রুন্দিসি মার্ক্স দুই ভাগে লিখেছেনঃ ‘ টাকা বিষয়ক অধ্যায়’ যাতে টাকা ও মূল্য আলোচিত আর ‘পুঁজি সম্পর্কিত অধ্যায়’ যেখানে উৎপাদনের প্রক্রিয়া ও পুঁজি সঞ্চলন চর্চা এবং উদ্বৃত্ত মূল্য ও প্রাক-পুঁজিতান্ত্রিক উৎপাদনের  অর্থনৈতিক গঠন চর্চিত। তাঁর প্রবল প্রয়াস সত্বেও সে কাজ সম্পূর্ণ করতে পারলেন না। লাসালকে ১৮৫৮-র ফেব্রুয়ারীতে লিখলেনঃ
“কয়েক মাস ধরে আমি আমার কাজের  শেষ পর্যায়ে । কিন্তু অত্যন্ত শ্লথ গতিতে এগোচ্ছে, কারণ অনেক বছর ধরে পড়াশোনার ভিত্তিতে অর্জিত বিষয়গুলির নিস্পত্তি না করে কেউ নূতনতর বিষয়পানে এগিয়ে যেতে পারে না, ভাবনার তাগিদও আসে না... এখন যে কাজে মনোনিবেশ করছি রা হ’ল  অর্থনৈতিক বিভাগগুলির সমালোচনা বা যাকে তুমি বলতে পারো বুর্জোয়া অর্থনীতি-ব্যবস্থার সমালোচনাত্মক উন্মোচন। একাধারে তা উন্মোচন আবার সেই নিরিখেই ব্যবস্থার সমালোচনা।আমার ধারণা নেই এজন্য আর কত পৃষ্ঠা লাগবে। আপাতত আমি কমপক্ষে আরো ১৫ বছর কাজ করতে প্রস্তুত। তবে আমার অস্বস্তি এই ভেবে যে ঝঞ্ঝাময় আন্দোলন বাইরে থেকে অন্তরায় হতে পারে.৯৪  
৫। গ্রুন্দ্রিসি লেখা
তাঁর কালে প্রধান প্রধান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ঘটনাবলীর প্রতি নজর মার্ক্স আজীবন রেখেছেন। এঙ্গেলস তখনও, ১৮৫৭র শরৎকালে, ঘটনাবলীর আশাবাদী মুল্যায়ন করে চলেছেন।“ আমেরিকায় এক দারুণ আর্থিক বিপর্যয় ও তা অনেকদিন চলবে।... আগামী তিন চার বছর বাণিজ্য নিম্নমুখী রইবে। এখন সুযোগ আমাদের হাতে। ”৯৫ তাই মার্ক্সকে উৎসাহভরে লিখলেনঃ “আমরা ১৮৪৮ সালেই বলছিলাম, এখন আমাদের দিন আসছে এবং একদিক থেকে তা ছিলই, কিন্তু এখন তা পূর্ণ রূপে আসন্ন এবং জীবন-মরণের সময়।৯৬ অন্যদিকে বিপ্লবের অনিবার্যতা নিয়ে সংশয় ছাড়াই তারা আশা করেছিলেন তা গোটা ইয়োরোপ সংকটে নিমজ্জিত হবার আগে তা ঘটবে না আর তাই ‘সংঘাতের বছর’ ১৮৫৮ অব্দি স্থগিত থেকেছিল।৯৭
ইয়েনি ফন হ্বেস্টফ্যালেন পারিবারিক সুহৃদ কনরাদ স্ক্র্যাম ( ১৮২২-১৮৫৮)কে লেখেন যে সর্বজনীন সংকট মার্ক্সের উপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল।“  কালোমানিক কিরকম খোসমেজাজে আছে আপনি কল্পনা করতে পারছেন। স্বাচ্ছন্দ্য ও কাজের মেজাজ ফিরে পেয়েছে আর কর্মশক্তি জীবন্ত ও প্রফুল্লতর হয়েছে।৯৮ আসলে, মার্ক্সের নিবিড় বৌদ্ধিক কর্মকান্ড সূচিত হয়েছিল,  ন্যু ইয়র্ক ট্রিব্যুন-এ লেখা, নিউ আমেরিকান সাইক্লোপিডিয়ার কাজ ও তখনকার সংকট নিয়ে পুস্তিকা লেখার অসমাপ্ত প্রকল্প  আর অবশ্যই গ্রুন্দ্রিসি লেখা সব এক গতি পেয়েছিল। তবে, তাঁর বর্ধিত কর্মশক্তি সত্বেও, এতগুলো দায়িত্ব একবারে হাতে নেওয়া সাধ্যাতীত হয়ে উঠল, তাই এঙ্গেলস এর সাহায্য অপরিহার্য হ’ল। তাঁর ১৮৫৮-র গোড়ায় নিরাময় হতে, মার্ক্স আবার এনসাইক্লওপিডিয়ায় তথ্য সন্নিবেশনের  কাজ শুরু করতে বললেনঃ” মাঝে মাঝে আমার মনে হয় তুমি যদি কয়েকটি অধ্যায়ের কাহ দিন দুয়েকে শেষ করতে পারো,ম্যাঞ্চেস্টারে থাকাকালীন দেখা  তোমার মদ্যপানাসক্তি কমবে, এখনকার কাজে উৎসাহ যোগাবে, যা আমার আছে দরকারি মনে হয়েছে। কারণ আমি আমার অন্য কাজগুলি শেষ করতে চাই, যে কাজে আমার সময়ের পুরোটাই নিয়ে নিচ্ছে। আমার বাড়ি মাথায় ভেঙে পড়লেও।” ৯৯
এঙ্গেলস মার্ক্সের চাঙ্গা করার প্রয়াস মেনে নিলেন ও তাঁকে আশ্বস্ত করলেন, ছুটির পরেই তিনি আরো নিরিবিলি ও সক্রিয় জীবনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছিলেন।১০০ তথাপি , মার্ক্সের সবচেয়ে সমস্যা হয়ে উঠল সময়াভাব।প্রিয় সখাকে বারবার অনুযোগ করছেন, “যখনই (ব্রিটিশ) মিউজিয়াম-এ যাই,  জরুরী কথা মনে আসে,তখন ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি বেরোনোর সময় (বিকেল ৪টে), কত কিছু চারদিকে ছড়িয়ে আছে। পথের শেষ, অথচ কত সময় নস্ট হয়ে গেছে।১০১ উপরন্তু আছে বাস্তব সমস্যাবলী, ঔপপ্ততিকও।“ গণনাগত ভ্রান্তিগুলির যাতনা আমাকে হতোদ্যম করছে। বীজগণিতের মাধ্যমে সংশোধনের প্রয়াস করছি। পাটিগণিত আমার চিরশত্রু, কিন্তু বীজগণিতের পাকদন্ডি আমাকে দ্রুত সমাধান বাৎলে দেয়।১০২ শেষে তাঁর বিবেকী দায়ের জন্যেই গ্রুন্দ্রিসি রচনায় মন্থরগতি দেখা দিল, কারণ তাঁর থিসিসগুলি মান্যতা পেতে পারে কি না, তা যাচাই করার আর্জি তাঁর  নিজের ভিতরেই জাগল। ফেব্রুয়ারী মাসে তিনি ফার্ডিন্যান্ড লাসালকে তাঁর গবেষণার স্তর ব্যাখ্যা করলেন, “ কিভাবে আমার অর্থশাস্ত্র এগোচ্ছে ,তা নিয়ে তোমাকে বলতে চাই। যা কাজ করেছি , তা লিখে ফেলেছি। প্রকৃতপক্ষে আমার চূড়ান্ত পান্ডুলিপি কয়েক মাস আগেই শেষ করেছি। কিন্তু বড্ড ধীরে ধীরে এগোচ্ছে, কারণ যতক্ষণ পর্যন্ত বিষয়গুলি শেষ না  করা হচ্ছে, ততক্ষণ নতুন দিশা দেখা দেবে না, চিন্তা এগিয়ে নিয়ে যাবার চাহিদা জাগবে না, কারণ এতদিন গবেষণার উদ্দিষ্ট তাই ছিল।”    ।             
সে চিঠিতেই মার্ক্স দুঃখ করেছিলেন তিনি দুর্দশাগ্রস্থ। “ আমি তো আমার সময়ের প্রভু নই, বরং তার দাস। আমার কাজের অবকাশ রাত্রিবেলা, এজন্যে পিত্তরোগে অতি ক্লিষ্ট অথবা প্রায়শ যকৃত সমস্যাক্তান্ত।” ১০৩  
     
সত্যিই, তিনি গুরুতর অসুস্থ হলেন আবার। এঙ্গেলসকে ১৮৫৮র জানুয়ারীতে লিখলেন, আরোগ্যলাভে তিন সপ্তা লেগে গিয়েছিল।“ রাতে মাত্রাতিরিক্ত  কাজ করার জন্য আমাকে লেমনেড ও প্রচুর পরিমান তামাক সেবনের উপর নির্ভর করতে হয়েছে।১০৪ মার্চে তিনি যকৃত-জনিত কারণে “আবার খুব অসুস্থ হলেন”ঃ কারণ “সম্প্রতি গার্হস্থ্য অর্থনৈতিক অবস্থায়  দিনের পর দিন অনেক রাত জেগে কাজ করার দরুন ছোটখাটো অসংখ্য অসুবিধার জন্য  আমি বারবার অসুস্থ হচ্ছি।”১০৫ এপ্রিলে তিনি আবার জানালেন, “ পিত্তজনিত গোলমালে এই সপ্তায়  আমি এত অসুস্থ হয়েছি , যে আমি ভাবতে, পড়তে  লিখতে বা ট্রিব্যুনের (ন্যু ইয়র্ক) লেখার জন্য সময় করে নেওয়া ছাড়া কিচ্ছু পারছি না। প্রাণপণে অভিশপ্ত অধমর্ণতা এড়াতে এই গাফিলতিগুলি মেনে নিতে পারি না।১০৬           
এমতাবস্থায়, মার্ক্স সাংগঠনিক রাজনৈতিক কাজকর্ম ও ব্যক্তিগত সম্পর্কগুলি  পুরোপুরি ছেড়ে দিয়েছিলেন। মুষ্টিমেয় বন্ধুদের চিঠি লিখে খোলাখুলি জানালেন, “ আমি নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছি’ ১০৭ এবং ‘আমি পারতপক্ষে পরিচিতদের সঙ্গেও দেখা করছি না, আর এজন্যে যে আমার বড় রকমের ক্ষতি হচ্ছে না।’ ১০৮ এঙ্গেলস-এর নিরবছিন্ন উৎসাহের সাথে সাথে  ‘মন্দা ও তার দুনিয়াজোড়া বিস্তৃতি তাঁকে আশাবাদী করে তুলছিল এবং কাজে নিয়োজিত হবার জোস্ত যোগাচ্ছিল, “এই সবই বৃদ্ধ গন্ধমূষিকের মত সংকটকে কুরে কুরে খাচ্ছিল।১০৯ ঘটনাপ্রবাহের অগ্রগতি তাঁকে কেমন উৎসাহিত করেছিল এঙ্গেলসের সঙ্গে চিঠিপত্রগুলিতে তা স্পস্ট।জানুয়ারীতে ‘ম্যাঞ্চেস্টার গার্ডিয়ান’এর খবর পড়ে, চমকিত হয়ে লিখলেন, “ সব কিছু মনে হচ্ছে  প্রত্যাশা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।১১০ এবং মার্চের শেষে সাম্প্রতিক ঘটনাবলী নিয়ে মন্তব্য করলেন, “ উন্মাদনা সন্তোষজনকভাবেই ঘটছে।গ্রীষ্ম অব্দি অবস্থা শান্তিপূর্ণ রইবে,তা মনে হচ্ছে না।”১১১ কয়েক মাস আগে, তিনি নৈরাশ্যের সুরে লিখেছিলেন, “ গত দশ বছত্রে যা ঘটেছে, তাতে যে কোন ব্যক্তির চিত্তে জনগণের প্রতি  ঘৃণা জাগিয়েছে , ঠিক লাতিন প্রবাদের মত (odi profanum vulgus et arceo) অর্থাৎ আমি মানুষের ভীড় ঘৃণা করি। পদাঘাত করি”১১২ –এমন ভাবনা আরোপিত বচনের মত দাঁড়িয়ে গিয়েছিল।এখন এই সব সংকীর্ণ চিত্তাবস্থা প্রথম ঝড়েই ধুয়ে মুছে যাবে।”১১৩
মে মাসে কিছুটা খুশি হয়েই লিখলেন, “ সবদিক থেকে এই সময়টা সুখকর। আপাতচোখে ইতিহাস এক নতুন পথের বাঁকে, প্রতি ক্ষেত্রেই ভাঙনের চিহ্ন আনন্দ সংবাদ , কারণ প্রত্যেকেই মানসিকভাবে আর রক্ষণশীলতাকে আঁকড়ে ধরে থাকতে পারছে না।১১৪
অনুরূপভাবেই, এঙ্গেলস মার্ক্সকে জানালেন যে তৃতীয় নেপোলিয়নকে (১৮০৮-১৮৭৩) হত্যার চেস্টার জন্য ইতালীয় গণতন্ত্রী ফেলিচে ওর্সিনির (১৮১৯-১৮৫৮) ফাঁসির দিন প্যারিসে শ্রমিক শ্রেণী ব্যাপক বিক্ষোভ জমায়েত করেছে, “সেই মহা ক্ষোভের প্রকাশ ভালো লাগল যখন মঞ্চ থেকে রোল কল-এর  আওয়াজ উঠল, যারা যারা এসেছেন বলুন, ১০০,০০০ মানুষ একসাথে বলে উঠলেন, ‘হাজির’।১১৫ এমন বিপ্লবী প্রস্ফূটনের সম্ভাবনার সময়, তিনি ফরাসী সেনা বাহিনী মোতায়েন-বৃদ্ধি সমীক্ষার ভিত্তিতে মার্ক্সকে সতর্ক করেছিলেন যে সেনা বাহিনীর মধ্যে গুপ্ত সমিতি গড়া দরকার,১৮৪৮-এর মতো, যখন বুর্জোয়ারা বোনাপার্টের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। শেষে, তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করলেন যে হাঙ্গেরী  অস্ট্রিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হবে  এবং প্রতিক্রিয়ার সাবেকী দুর্গ অস্ট্রিয়া সাম্রাজ্য হিংসাত্মক  স্লাভ বিদ্রোহে প্রকম্পিত হবে। সাথে সাথে প্রত্যেকটি বড় শহর ও শিল্প নগরীতে প্রতি আক্রমণ সংকট তীব্রতর করবে। অন্যভাবে বললে, তিনি স্থিরনিশ্চয় যে এক কঠিন সংগ্রাম আসন্ন।১১৬ আশাবাদে উদ্দীপ্ত এঙ্গেলস আবার অশ্বারোহন শুরু করলেন এবং তাঁর লক্ষ্যের কথা মার্ক্সকে জানালেন।“ কাল ঘোড়ায় চড়ে নদীতীরে গিয়েছিলাম। পাঁচ ফুটেরও কয়েক ইঞ্চি বেশী উঁচু বেড়া অতিক্রম করলাম এটা আমার সর্বোচ্চ উল্লম্ফন... । জর্মনীতে ফিরে গিয়ে আমরা প্রুশীয় অশ্বারোহন প্রদর্শন করতে পারব। আত্মসন্তোষপূর্ণ উত্তর এলো- “ তোমার অশ্বারোহন সাফল্যে অভিনন্দন জানাই। কিন্তু বেশী ঝুঁকি নিয়ে  উল্লম্ফন  কোরো না। কারণ তোমার গ র্দান অন্যত্র বেশী প্রয়োজন। অশ্বারোহনে নৈপুণ্য এমন নয় যে যাতে তুমি জর্মনীর মহান সেবা করতে পারবে।১১৮      
অন্যদিকে, মার্ক্সের জীবনের জটিলতা আরো বাড়ল। মার্চ-এ লাসাল তাঁকে জানালেন, বার্লিন থেকে সাংবাদিক-সম্পাদক ফ্রানৎস দুঙ্কার (১৮১৩-১৮৭৯) তাঁর লেখা ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করতে রাজি হয়েছেন, কিন্তু সুসংবাদটি এক অস্থিতিশীলতার মাঝে এলো। এঙ্গেলসকে লেখা একটি চিঠিতে মার্ক্স-সহধর্মিনী ইয়েনি স্বাস্থ্য বার্তায় অগুনতিবার উল্লিখিত দুশ্চিন্তাজনিত উদ্বেগের কথা জানালেনঃ “ ওঁর পিত্ত ও যকৃত বিদ্রোহ করছে। অবস্থার অবনতি প্রকাশকের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তির পরে উদ্ভূত মানসিক অস্বস্তি ও উৎকণ্ঠার কারণে যা প্রতিদিন বাড়ছে ও বড় আকার ধারণ করছে, কারণ সেই কাজটা স্থগিত রাখা একেবারেই স ম্ভব নয়।” ১১৯     
গোটা এপ্রিল মার্ক্সকে অসহ্য পিত্ত যন্ত্রণা ভোগ করতে হ’ল, যা আগে কখনো ঘটেনি, কাজ করতেই পারছিলেন না।ন্যু ইয়র্ক ট্রিব্যুনের জন্য প্রবন্ধ রচনার কাজই করলেন, কারণ তা গ্রাসাচ্ছাদনের জন্য অপরিহার্য ছিল।সেগুলি লিপিবদ্ধ করতে মুখে বলছিলেন তাঁর স্ত্রীকে যিনি সেই সময় তাঁর ‘সচিবের কাজ করছিলেন।’১২০ যেই আবার লিখতে পারলেন, এঙ্গেলসকে জানালেন, ‘নিজে হাতে লিখতে না পারার জন্যে’ নীরব ছিলেন।‘শুধুমাত্র লেখার ভাষায় নয়, আক্ষরিকভাবেও’ পরিস্ফুট হয়েছিল। তিনি এও লিখলেন, “কাজ করার অদম্য উৎসাহ আর একই সঙ্গে  তা না করতে পারা রোগের প্রকোপ বাড়িয়ে তুলেছিল’। তখনও তার শারীরিক অবস্থা খুব খারাপ।“ আমি কাজ করতেই পারছি না ঘণ্টা দুয়েক কাজ করলেই শুয়ে পড়তে হয়। আমি আশা করি, কিছু তোয়াক্কা করব না। আর এই অবস্থার অবসান ঘটবে সামনের সপ্তাতেই। এখনকার মত কঠিন সময় আর হতে পারে না। স্পস্টতই, এই শীতে আমি রাতে বেশী পরিশ্রম করেছিলাম। ‘সুতরাং এই ক্লেশ (Hinc illae lacrimae)১২১                   
মার্ক্স রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করছিলেন, কিন্তু প্রচুর পরিমাণ ওষুধ খেয়েও উপকার পাচ্ছিলেন না। তাই পরের সপ্তায় অবস্থা বদলের প্রত্যাশায় চিকিৎসকের পরামর্শ মত চলছিলেন এবং ‘ বৌদ্ধিক শ্রম থেকে ক্ষণেকের জন্যে রেহাই মেনে নিয়েছিলেন।’১২২ তাই তিনি এঙ্গেলসের কাছে যাবার সিদ্ধান্ত নিলেন, তাঁকে গিয়ে জানালেনঃ “ আমি আমার কাজ স্থগিত রাখছি।”১২৩ কাজেই দিন ২০ ম্যাঞ্চেস্টারে থেকে কাজ করলেন, ‘পুঁজি-র একটি অধ্যায় ও গ্রুন্দ্রিসি-র শেষ পাতাগুলি লিখলেন।
৬। বুর্জোয়া সমাজের বিরুদ্ধে সংগ্রাম
লন্ডনে ফিরে মার্ক্সের উচিৎ ছিল পান্ডুলিপি সম্পাদনা করা যাতে তা প্রকাশকের কাছে পাঠানো যায়, কিন্তু ইতিমধ্যেই বেশ দেরী করে ফেলেছেন। খসড়া প্রস্তুত করতে আরো দেরী করছেন। তাঁর  খুঁতখুতে স্বভাব বাস্তবিক প্রয়োজনকে দাবিয়ে রাখল। এঙ্গেলসকে লিখছেন, “ আমি যখন ছিলাম না অর্থ মুদ্রার ইতিহাস নিয়ে ম্যাকলরেন-এর একটা বই লন্ডনে প্রকাশিত হয়েছে। ‘একনমিস্ট’-এ প্রকাশিত উদ্ধৃতাংশ পড়ে মনে হচ্ছে প্রথম শ্রেণীর কাজ। এখনো গ্রন্থাগারে বইটা আসেনি। স্বভাবতই , বইটা আমাকে পড়তেই হবে আমার বই সম্পূর্ণ করার আগে। আমার স্ত্রীকে শহরের প্রকাশকের কাছে পাঠিয়ে ছিলাম। দাম শুনে হতবম্ব ৯.৬ শিলিং । আমার লড়াই-এর তহবিলের চেয়েও বেশী। তাই যদি তুমি আমাকে টাকাটা পাঠিয়ে দাও, কৃতজ্ঞ থাকব।হয়ত বইটিতে এমন কিছু থাকবে না, যা আমার কাছে নতুন, কিন্তু একনমিস্ট তো শোরগোল তুলেছে এবং উদ্ধৃতাংশ পড়ে , আমার ঔপপত্তিক চেতনা বইটা না পড়ে একটুও এগোতে দিচ্ছে না।১২৪
এই চরিত্রচিত্র খুব প্রণিধানযোগ্য। একনমিস্ট-এর সমালোচনা তাঁর পারিবারিক শান্তির পক্ষে এতই ‘বিপদস্বরূপ’ যে তাঁর স্ত্রীকে মার্ক্স শহরে পাঠালেন ঔপপত্তিক সংশয়ের বশে। আর তার সঞ্চয় এমন ঞ্ছিল না যা দিয়ে বইটা কিনতে পারেন। তাই বিষয়টি  তাঁর ম্যাঞ্চেস্টারের বন্ধুর গোচরে আনলেন। সেই সময়ে মার্ক্সের জীবন ও বিশেষত তাঁর ‘ঔপপত্তিক চেতনা’কে  বোঝার এমন ভালো দৃষ্টান্ত কোথায় পাওয়া যেত?
চেনা শত্রু জটিল মেজাজ, অসুস্থ শরীর ও দারিদ্র্য তাঁর কাজকর্ম আরো ধীরগতি হ’ল। আরো কাহিল হল তাঁর স্বাস্থ্য। এঙ্গেলসকে জানিয়েছিলেন, “ ম্যাঞ্চেস্টার যাবার আগে যে রোগে ভুগছিলাম, তা আবার দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে , গোটা গ্রীষ্মকাল এমনই হয়েছে যে কোন লেখার কাজ করতে খুব কস্ট হয়েছে।১২৫ অধিকন্তু ঐ মাসগুলি অসহনীয় অর্থ কস্ট তাঁকে ‘ চূড়ান্ত বিপর্য্যয়ের অনিবার্য শঙ্কার মধ্যে’ কেটেছে।১২৬ হতাশা-কবলিত মার্ক্স জুলাইতে এঙ্গেলসকে তাঁর চরম দুর্দশাগ্রস্থ জীবন যাপনের কথা  লিখলেন, “বর্তমান অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা ভাববার সঙ্গতি নেই , কিছুতেই পেরে উঠছি না। ফলে কাজ করার ক্ষমতাই নেই, যার কারণ অংশত আমার সবচেয়ে ভালো সময় আমি অর্থোপার্জনের বৃথা চেস্টায় সময় নষ্ট করেছি এবং অংশত আমার বিমূর্ততা আর তার সঙ্গে আমার শারীরিক ভাঙন । এসব আমার গার্হস্থ্য দুর্দশার সাথে বেমানান। দুর্দশায় আমার স্ত্রীর স্নায়বিক বিপর্যয় ঘটেছে... তাই সমস্ত ব্যাপারটাই এমন দাঁড়িয়েছে  স্বল্প যা আয় করেছি, তার কণামাত্র পরের মাসের জন্য রাখতে পারি না যাতে করে দেনা দায় লাঘব হতে পারে, দুরবস্থা কেবল চার সপ্তা স্থগিত থাকতে পারে এবং কোন না কোন উপায়ে ঠেকাতে পারি... আমার আসবাবপত্র নিলাম করলেও অচিরে  দেনাদাররা  তুস্ট হবে না। লুকোনো গর্তও তাদের চোখ এড়ায় না। এতদিন বাহ্যিক সম্ভ্রম বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচিয়েছে। আমি নিজে হোয়াইট চ্যাপেল-এ (লন্ডনের নিকটে শ্রমিক শ্রেনীর আস্তানা)  গিয়েও থাকতে পারি, যদি দিনে অন্তত এক ঘন্টা আবার নিরুপদ্রবে কাজ করতে পারি। কিন্তু আমার স্ত্রীর যা অবস্থা  যে অমন আমূল রূপান্তরের ফল খুব খারাপ হতে পারে। মেয়েদের লালন পালনে আদৌ অনুকূল হবে না। বস্তুত, গত আট সপ্তা আমার চরম শত্রুও এমন জলাভূমিতে  আমার সাথে আবদ্ধ থাকতে পারত না, অসংখ্য বিরক্তি আমার বুদ্ধিজীবিতা ক্ষূণ্ণ করেছে, আমার কর্মক্ষমতা ধ্বংসের দিকে নিয়ে গেছে।১২৭           
তবু, তীব্র দুর্দশাগ্রস্থ অবস্থা সত্বেও মার্ক্স নিরাপত্তাহীনতার কাছে হার মানেন নি, বিশেষত তাঁর আরব্ধ লেখার কাজ সম্পূর্ণ করার ব্যাপারে।বন্ধু জে ওয়াইডেমেয়ারকে(১৮১৮-৬) লিখলেনঃ “ যে কোন মূল্যে আমার লক্ষ্য পূরণ করতেই হবে, আমাকে টাকা-তৈরির যন্ত্র করতে বুর্জোয়া সমাজকে  দেবো না” ১২৮
ইতিমধ্যে অর্থনৈতিক সংকট কমেছে এবং বাজার শীঘ্রই স্বাভাবিক হয়ে উঠবে।১২৯ ভগ্নহৃদয় মার্ক্স অগাস্টে এঙ্গেলস-কে লিখলেনঃ “ গত কয়েক সপ্তায় হতচ্ছাড়া আশাবাদ সর্বত্র চাগিয়ে উঠেছে’১৩০ ,এবং যেভাবে পণ্যের ইতি-উৎপাদনের বাজার শুষে নিচ্ছে, তা নিয়ে এঙ্গেলস মার্ক্সকে লিখলেন, “ এই পরিমান পণ্য বাজার থেকে উধাও কখনো হয় নি। ” ১৩১ সেই ১৮৫৬র গোটা শরৎকাল জুড়ে প্রেরণাদায়ী আসন্ন বিপ্লব  মার্ক্সকে গ্রুন্দ্রিসি লিখতে উদ্বুদ্ধ করেছিল,আর তখন তিনিই স্বপ্নাহত, “আর যুদ্ধ নেই, সব বুর্জোয়াদের করতলগত।” ১৩২ এঙ্গেলসের ক্ষোভ ছিল “ইংরেজ সর্বহারা শ্রেণীর বুর্জোয়া-ভাবাপন্ন হয়ে ওঠায়”, যে প্রবণতা দুনিয়ার সবচেয়ে শোষণকারী দেশে  ‘বুর্জোয়াদের পাশে বুর্জোয়া-বনে-যাওয়া সর্বহারাদের’ কায়েম করবে।১৩৩ মার্ক্স প্রতিটি স্বল্প-তাৎপর্য পূর্ণ ঘটনার অন্তিম অবধি অবলোকন করছিলেন- “বিশ্ব বাণিজ্যে আশাবাদী মোড় সত্বেও... একটা ব্যাপারে স্বস্তি রাশিয়ায় বিপ্লব শুরু হয়েছে,কেন না আমার মতে পিটার্সবার্গে ‘অমাত্যদের’ সমাবর্তন উৎসব তার সূচনা।” তাঁর প্রত্যাশা ছিল জর্মনীকে ঘিরেইঃ “ প্রুশিয়ার অবস্থা ১৮৪৭ থেকেও খারাপ”, আবার চেকোশ্লোভাকিয়ার বুর্জোয়ারাও জাতীয় স্বাধীনতার জন্য লড়াইয়ে অবতীর্ণ, ‘ব্যতিক্রমী আন্দোলনে শ্লাভেরা নেমে পড়েছে, বিশেষ করে বোহেমিয়ায়। তা প্রতিবিপ্লবী চরিত্রের হলেও আন্দোলনকে রসদ যোগাচ্ছে’। শেষত,  যেন বিশ্বাসঘাতকতা-ঘাত বলেই, তিনি চাঁচাছোলা সুরে লিখলেনঃ “ এসবে  ফরাসীদের কোন ক্ষতি হবে না, কারণ তাদের ছাড়াই দুনিয়া চলতে পারে।” ১৩৪
যাই হোক,  মার্ক্স সাক্ষ্যের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নিলেন, কারণ তাঁর ও এঙ্গেলসের প্রত্যয়িত প্রত্যাশানুসারে    সংকট সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বর্তালো না। তথাপি তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল  ইয়োরোপে বিপ্লবী অভ্যুত্থান সময়ের ব্যাপার এবং সেটা যদি ঘটে, তা বিশ্ব পরিস্থিতির অর্থনৈতিক পরিবর্তন তা প্রোজ্জ্বলিত করবে। তাই এঙ্গেলসকে একদিক থেকে সাম্প্রতিক ঘটনাবলী ও  তার ভবিষ্যৎ প্রতিফলনের রাজনৈতিক মূল্যায়ন করে  লিখলেনঃ ““আমরা অস্বীকার করতে পারি না যে বুর্জোয়া সমাজ এই নিয়ে দ্বিতীয়বার ষোড়শ শতাব্দীর মুখোমুখি হ’ল, যা আমার আশা তাদের মৃত্যুবাণের মত, ঠিক আগের মত। বুর্জোয়া সমাজের প্রকৃত উদ্দেশ্য বিশ্ব বাজার সৃষ্টি বা অন্তত তার সাধারণ কাঠামো তৈরি করা এবং বাজারের প্রয়োজনমতো উৎপাদন। যেহেতু বিশ্ব গোলাকার, আমার মনে হচ্ছে ক্যালিফর্নিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার ঔপনিবেশিকরণ এবং চীন ও জাপানের বাজার মুক্ত হওয়া মনে হচ্ছে এই প্রক্রিয়ার সম্পূর্ণকরণ। এই কঠিন প্রশ্নটি আমাদের কাছে এইরকমঃ এই মহাদেশে বিপ্লব আসন্ন এবং সত্বর তা সমাজতন্ত্রের রূপ নেবে। যেহেতু বুর্জোয়া সমাজের গতিধারা আরো অনেক বড় এলাকা জুড়ে আছে, পৃথিবীর এক ছোট্ট কোনে এটি ঘটলে তা কি চূর্ণ হবে না?১৩৫
এই চিন্তাবলীর মধ্যে রয়েছে মার্ক্সের দুটি সর্বাধিক তাৎপর্যপূর্ণ ভবিষ্যদ্বাণী – যুক্তি ও স্বজ্ঞার মিলিত প্রয়োগে উপনীত যা তাঁর সমসাময়িকদের অনায়ত্ত ছিল। একটি মিলেছিল – পুঁজিতন্ত্রের বিশ্ব পরিসরে বিস্তার। আরেকটি মেলেনি- ইয়োরোপে সর্বহারা বিপ্লবের অনিবার্যতা।     
তখনকার প্রগতিশীল শিবিরে যাঁরা রাজনৈতিকভাবে মার্ক্সের বিরোধী ছিলেন এঙ্গেলসকে লেখা চিঠিগুলিতে তাঁদের তীক্ষ্ণ সমালোচনা ছিল। তাঁদের মধ্যে ছিলেন তাঁর প্রিয়জনদের অন্যতম – প্রুধোঁ, ফ্রান্সে প্রভাবশালী সমাজতন্ত্রবাদীদের প্রধান নেতা, মার্ক্স যাঁকে আখ্যাত করেছিলেন ‘ ভূয়া ভ্রাতা’ ,যার কবলমুক্ত হওয়া সাম্যবাদের বাঞ্ছনীয়।১৩৬ মার্ক্স লাসালের সঙ্গে রেষারেষিতে বেশ মজা পেতেন। যেমন লাসালের তখনকার সাম্প্রতিকতম বই ‘হেরাক্লিটাস’ হাতে পেয়ে বলেছিলেন ‘নির্বোধ উদ্ভাবন।১৩৭ গিউসেপ্পি মাৎসিনি (১৮০৫-৭২)র ইশতেহার পেনসিয়োরো এদ অ্যাৎসিওন (চিন্তা ও কর্ম) ১৮৫৮-র সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত হলে মার্ক্স মন্তব্য করলেন ‘এখনো নিরেট মূর্খই রয়ে গেছে’, কারণ তাঁর চিন্তাশক্তির অপ্রতুলতা নিয়ে মার্ক্সের কোন সংশয় ছিল না।১৩৮ মাৎসিনি ১৮৪৮-৪৯-এর পরাভবের কারণগুলি ব্যাখ্যার বদলে ‘ বিপ্লবী অভিবাসনের   রাজনৈতিক পক্ষাঘাত নিরাময়-এর অনুমোদনের জন্য আত্মপ্রচারে ব্যস্ত।১৩৯ তিনি জুলিয়াস ফ্রাউবেল(১৮০৫-৯৩)-এর বিরুদ্ধেও নেমে পড়লেন। ফ্র্যাঙ্কফুর্ট পরিষদের ১৮৪৮-৪৯এ সদস্য ইনি দেশ ছেড়ে পালিয়ে গিয়ে রাজনৈতিক সংশ্রবছিন্ন হয়েছিলেন। ‘ একবার খাওয়া পড়ার নিশ্চয়তা মিললে এই ধরণের দুর্বৃত্তেরা কোন না কোন ছলে লড়াই-এর পথ থেকে সরে যায়।১৪০  সবশেষে তিনি লন্ডনে জর্মন দেশত্যাগীদের অন্যতম নেতা কার্ল ব্লিন্ড-এর বিপ্লবী কার্যকলাপকে ঠেস দিয়ে লিখলেনঃঠ“হ্যামবুর্গে তাঁর দু-একজন পরিচিতকে দিয়ে (তাঁর নিজেরই খসড়া) কয়েকটি ইংরেজী সংবাদপত্রে চিঠি পাঠালেন, যাতে দাবি করা হ’ল যে ছদ্মনামে প্রচারিত প্রচার পুস্তিকাগুলো আলোড়ন তুলেছে।তারপরে তাঁর বন্ধুরা কিছু জর্মন সংবাদপত্রে লিখল যে ইংরেজী সংবাদপত্রগুলিতে লেখা চিঠিগুলি হৈ চৈ ফেলে দিয়েছে।তাহলে বুঝুন কিরকম করিৎকর্মা এই লোকটি।”১৪১     
মার্ক্সের রাজনৈতিক কার্যকলাপ ভিন্ন ধরণের ছিল।বুর্জোয়া সমাজের বিরুদ্ধে সংগ্রাম থেকে বিচ্যুত না হলেও, তিনি তাঁর মূল ভূমিকা পালনে সদা জাগরুক ছিলেন অর্থাৎ রাজনৈতিক অর্থনীতি ও অর্থনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের অনুপুঙ্খ অধ্যয়নের মাধ্যমে পুঁজিতান্ত্রিক উৎপাদনের সমালোচনা প্রণয়ন-এর কাজে ব্যাপৃত থাকা। এ কারণে শ্রেণী সংগ্রামে ‘ভাঁটা’র সময় তিনি নিরর্থ চক্রান্ত ও ব্যক্তিগত কোন্দল থেকে সরিয়ে রাখার জন্য যথাসাধ্য সক্রিয় হতেন, যাতে  রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থেকে দূরে থাকা যায়- “কোলন বিচার ( কমিউনিস্ট দের বিরুদ্ধে ,১৮৫৩ সালে), আমি নিজেকে সরিয়ে নিয়ে পূর্ণ সময় লেখাপড়ার কাজে মনোনিবেশ করি। আমার সময় এত মূল্যবান যে এই সব নিস্ফলা প্রয়াস ও সংকীর্ণ কোন্দলে তা নস্ট হতে দিতে পারি না।”১৪২ আসলে,সমস্যাবলীর প্লাবন সত্বেও মার্ক্স-এর গবেষণায়  বিরতি ছিল না। সযত্নে কাজ করে ১৮৫৮র অগাস্ট থেকে অক্টোবরে  ‘টাকা-র অধ্যায়’এর রাজনৈতিক অর্থনীতির সমালোচনা বিষয়ক সন্দর্ভের তৃতীয় অধ্যায়ের মূল পান্ডুলিপি সম্পূর্ণ  করেন- ১৯৫৯য় ‘রাজনৈতিক অর্থনীতির সমালোচনা বিষয়ক সন্দর্ভ ‘ প্রকাশ করেন, যেটি জনমানসে প্রভাব ফেলল না, গ্রুন্দ্রিসি সাড়া জাগাবে কি না তার আগাম ইঙ্গিত পেলেন।

মার্ক্সের ১৮৫৮ সালটা আগের বছরগুলোর মতই কাটল। ইয়েনির ভাষায় “ আমাদের কাছে ১৮৫৮ বছরটা ছিল না ভালো, না মন্দ।। দিনের পর দিন কেটেছে,; খেয়ে, পান করে, প্রবন্ধ লিখে, সংবাদপত্র পড়ে, অবসরে হেঁটে, এই ত আমাদের জীবনধারা।”১৪৩  দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর মার্ক্স প্রবন্ধ সম্ভারের জন্য কাজ করে গেছেন। গ্রুন্দ্রিসির খসড়া রচনার জন্য তিনি বিপুল শ্রমের বোঝা কাঁধে নিয়েছিলেন, শুধুমাত্র তাঁর দৃঢ় সংকল্প ও ব্যক্তিত্বের বলে – তৎসহ অবশ্যই তাঁর অচঞ্চল বিশ্বাস যে তিনি বেঁচে আছেন এমন এক সংগ্রামে লিপ্ত থেকে যার লক্ষ্য নিযুত নিযুত নরনারীর মুক্তি।
টিকা নির্দেশ

১ Karl Marx to Friedrich Engels, 26 September 1856, in MECW, vol. 40, p. 70.
 ২ Friedrich Engels to Karl Marx, 26 September 1856, in MECW, vol. 40, p. 72
৩  উত্তরকালে এই পান্ডুলিপিগুলির শিরোনাম দেওয়ায় মার্ক্স যা থেকে প্রেরণা পান, তা নিয়ে নিজেই লিখেছেনঃ “ সারারাত পাগলের মত খেটেছি এবং প্রতিদিন রাতে অর্থনৈতিক অধ্যয়ন খতিয়ে মিলিয়ে দেখেচ্ছি যাতে প্রলয়ের আগেই গ্রুন্দ্রিসি-র রূপরেখা আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়।” Karl Marx to Friedrich Engels, 8 December 1857, in MECW, vol. 40, p. 257.  
৪ ঐ.
৫  প্রণিধানযোগ্য এই যে ১ম খাতাপত্রের প্রথমাংশে ১৮৫৭-র জানুয়ারী-ফেব্রুয়ারীতে লেখা অ্যালফ্রেড ডারিমন-এর ‘রিফর্ম অফ ব্যাঙ্কস’ এর উপর মার্ক্সের সমালোচনাত্মক বিশ্লেষণ আছে; এব্যাপারে  গ্রুন্দ্রিসি-র সম্পাদক ঠিক লেখেন নি। দেখুন Inna Ossobowa, ‘Über einige Probleme der ökonomischen Studien von Marx im Jahre 1857 vom Standpunkt des Historikers’, Beiträge zur Marx-Engels-Forschung, 1990, no. 29, pp. 147-61
৬ দ্রস্টব্য সাম্প্রতিক প্রকাশিত MEGA², IV/14 খন্ড
.৭ দ্রস্টব্য Michael Krätke, ‘Marx’s “Books of Crisis” of 1857-8’, in Marcello Musto (ed.), Karl Marx’s Grundrisse: Foundations of the Critique of Political Economy 150 Years Later. London/New York: Routledge, 2008, pp. 169-175.
৮  Karl Marx to Friedrich Engels, 18 December 1857, in MECW, vol. 40, p. 224. তার কিছুদিন বাদে মার্ক্স লাসালকে তাঁর লেখার পরিকল্পনা জানিয়ে লেখেন, “বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি আমাকে রাজনৈতিক অর্থনীতি নিয়ে অনুপুঙ্খভাবে লেখার রূপরেখা তৈরি করার প্রেরণা যোগায় ও চলতি সংকট নিয়ে কিছু ভাবার প্রস্তুতিতে উদ্বুদ্ধ করে”, Karl Marx to Ferdinand Lassalle, 21 December 1857, in MECW, vol. 40, p. 226.
৯ লাসালকে ১২ নভেম্বর ১৮৫৮য় লিখলেন, “জর্মন অর্থে, অর্থশাস্ত্র এখনও অনালোচিত” , MECW, vol. 40, p. 355.
১০ ‘ভুমিকা’য় বৃহদাকার সমালোচনামূলক মালমশলাসমাহার এর গুরুত্বপূর্ণতার সংকেত। তার প্রথম প্রকাশ (১৯০৩) থেকেই তাবৎ সমালোচনামূলক ব্যাখ্যাগুলি, বুদ্ধিদীপ্ত জীবনীসমূহ মার্ক্সের চিন্তার মুখবন্ধে তার প্রক্ষেপন আছে, যা অসংখ্য প্রবন্ধ ও প্রতিবেদনে প্রতিপাদ্য। এ ব্যাপারে  বিশেষভাবে দ্রস্টব্য Terrell Carver, Karl Marx: Texts on Method. Oxford: Blackwell, 1975, pp. 88-158; and Marcello Musto, “History, production and method in the ‘1857 Introduction’”, in Musto (Ed.) Karl Marx’s Grundrisse. Foundations of the Critique of Political Economy 150 Years Later, পূর্বোল্লেখ, , pp. 3-32
১১  Karl Marx, Grundrisse. Harmondsworth: Penguin Books, 1993, p. 69.
১২  12 Marx, Grundrisse, op. cit., p. 83.
১৩  দ্রস্টব্য Ian Watt, ‘Robinson Crusoe as a Myth’, Essays in Criticism, vol. I (1951), no. 2, p. 112.
১৪  Marx, Grundrisse, পূর্বোল্লেখ., p. 83.
১৫ ঐ , p. 496.
১৬ ঐ p. 472
১৭  ঐ p. 471
১৮ . ঐ pp. 471-513. গ্রুন্দ্রিসি-র ‘ পূঁজিতান্ত্রিক উৎপাদনের প্রাক্কালে রূপ’ সংক্রান্ত অংশে মার্ক্স এ নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন।
১৯ ঐ p. 486.
২০ ঐ  p. 84. গ্রামের জন্মের আগে পরিবারের উদ্ভব = এই অ্যারিস্টটলীয় জরায়ু (সামাজিক) ধারণা ‘পুঁজি’র প্রথম খন্ডেও আছে। তবে কথিত আছে মার্ক্স এই ধারণা পরিত্যাগ করেন। এঙ্গেলস ১৮৮৩ সালে প্রকাশিত জর্মন সংস্করণের টিকায় লেখেন, ‘ মানুষের আদিম অবস্থার অত্যন্ত অনুপুঙ্খ সমীক্ষা লেখককে (অর্থাৎ মার্ক্স) অবশেষে এই সিদ্ধান্তে উপনীত করে যে মানুষ  গোষ্ঠীর ভিত্তি  থেকে গড়ে ওঠেনি, বরং গোষ্ঠীই আদিম রূপ , যা থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে মানব সমাজের জন্ম, যার ভিত্তি রক্তের সম্পর্ক, ফলে গোষ্ঠীগত বন্ধন জায়মানভাবে শিথিল হয়ে যায়, পরবর্তীতে নানা প্রকার পরিবার গড়ে ওঠে।’ Karl Marx, Capital, Volume III, in MECW, vol. 37, p. 356.  এঙ্গেলস এখানে বলছেন  প্রাচীন ইতিহাস নিয়ে তাঁর নিজের ও মার্ক্সের শেষ জীবনের অধ্যয়নের কথা ( এ ব্যাপারে এই গ্রন্থের ১০, অধ্যায়ে মার্ক্সের নৃতত্ববিষয়ক খাতাপত্র নিয়ে বিশদ আলোচনা আছে)।
২১  Marx, Capital, Volume III, পূর্বোল্লেখ., p. 88.
২২ ঐ ,p. 357. এর দশ বছর আগে ‘উপক্রমনিকা’য় মার্ক্স   জোর দিয়ে বলেছিলেন, ‘গোষ্ঠীবদ্ধ সমাজের কেন্দ্রে  বিনিময় গঠন উপাদান, এ ধারণা ভুল । এর সূত্রপাত বিভিন্ন গোষ্ঠীর আদানপ্রদানে, কোন একক গোষ্ঠীর ভিতরে নয়। ’ Marx, Grundrisse, op. cit. p. 103.
২৩ Marx, Grundrisse, পূর্বোল্লেখ., p. 162 এই পারস্পরিক নির্ভরশীলতাকে পুঁজিতান্ত্রিক উৎপাদনে ব্যষ্টির অবস্থানের সাথে এক করে দেখা অনুচিত- প্রথমটি প্রকৃতি-সৃষ্ট, দ্বিতীয়টি ইতিহাস-উদ্ভূত। পুঁজিতন্ত্রে ব্যষ্টির নির্ভরশীলতা নির্ভরশীলতা সামাজিক নির্ভরশীলতা অন্বিত, যা  শ্রম বিভাগে ব্যাখ্যাত। দ্রস্টব্য মার্ক্স-এর ‘রাজনৈতিক অর্থ নীতি সমালোচনা নিয়ে প্রতিবেদন’ এর দ্বিতীয় অধ্যায় ও তৃতীয় অধ্যায়ের প্রারম্ভের মূল টেক্সট- MECW, vol. 29, p. 465 । উৎপাদনের সেই স্তরে কার্যপ্রণালীর সামাজিক চরিত্র শুধু একের সাথে অন্যের সরল সম্পর্ক তুলে ধরে না, ‘কিন্তু ( তুলে ধরে-অনুবাদক) তাদের সম্পর্কের অধীনতা তাদের বাঁচিয়ে রাখে তাদের অস্তিত্ব-নিরপেক্ষভাবে, যা থেকে পারষ্পরিকভাবে অনীহ ব্যক্তিদের মধ্যে সংঘাত ঘটে। প্রতিটি ব্যক্তির অত্যাবশ্যক শর্ত তাদের কার্যকলাপ ও উৎপাদন বিনিময় , যা তাদের স্বতই বিযুক্ত করে।’  Marx, Grundrisse, পূর্বোল্লেখ., p. 157.  
২৪  Adam Smith, The Wealth of Nations, vol. 1. London: Methuen, 1961, p. 19.
২৫ See David Ricardo, The Principles of Political Economy and Taxation. London: J. M. Dent & Sons, 1973, p. 15. Cf. Marx A Contribution to the Critique of Political Economy, in MECW, vol. 29, p. 300.
২৬ Marx, Grundrisse, পূর্বোল্লেখ., p. 83.
২৭  মার্ক্সের অভিমত অর্থশাস্ত্রবিদ জন স্টূয়ার্ট মিল এই সরল অনুমান এড়িয়ে গেছেন। তিনি ১৮৫১-র  বসন্তকালে মিল-এর সম্পর্কে তাঁর রাজনৈতিক অর্থনীতির মুল কথা সংক্রান্ত অনুসন্ধান নিয়ে গ্নন্থের  বহু অনুচ্ছেদ সম্পর্কে মন্তব্য  করেছেন। দ্রস্টব্য  see Karl Marx, ‘Exzerpte aus James Steuart: An inquiry into the principles of political economy’, in MEGA², vol. IV/8.
২৮ Marx, Grundrisse, op. cit., p. 84. গ্রুন্দ্রিসি-র অন্যত্র মার্ক্স বলেছেন ‘ কোন বিচ্ছিন্ন ব্যক্তির ভূমি ও মৃত্তিকার মালিকানা আছে তা  বলতে পারে না।  ঐ, p. 485। ভাষা কোন ব্যক্তির উৎপাদক হতেই পারে না। কিন্তু সম্পত্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ঐ  p. 490.
২৯ ঐ., p. 83.
৩০ ঐ., p. 84.
৩১ ঐ., p. 83.
৩২ টেরেল কার্ভার ‘উপক্রমনিকা’য় সম্পাদকীয় নিবন্ধে (দ্রস্টব্য Carver, পূর্বোল্লেখ., pp. 93-5 )দর্শিয়েছেন যে রবিন্সন ক্রুশো নিয়ে বাস্তিয়া-র ধারণা নিয়ে মার্ক্সের মন্তব্য লেখকের কথিত উক্তির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়, কারণ ড্যানিয়েল ডিফো তার উপন্যাসে প্রতীয়মান সত্য তুলে ধরতে পারতেন না  যদি না তাঁর নায়ককে জাহাজডুবি থেকে বাঁচাতে বারুদ, রাইফেল, ছুড়ি, বোর্ড ইত্যাদি অপরিহার্য জিনিষের মত সামাজিক সুবিধাদির সাশ্রয় করতেন, যা সমাজে যে কোন মানুষের প্রয়োজনীয় পরিবেশের নিয়ামক সাক্ষ্য কারণ ঔপন্যাসিক তাকে সমাজের বাইরে রাখতে পারেন না।, লক্ষ্যণীয়, রবিন্সন ক্রুশো  তার সাথে নিয়ে গেছে নির্জনতা, যা তার সহস্রগুন বড় সম্পদ... আমি বলছি তার ভাবনা, স্মৃতিচয়ন ও বিশেষত ভাষার কথা।’ Frédéric Bastiat, Economic Harmonies. Princeton: D. van Nostrand Co. Inc., 1964, p. 64. তথাপি তাঁর বইটিতে অন্যত্র বাস্তিয়া-র ইতিহাস চেতনার খামতি স্ফূট,যেখানে তিনি লিখেছেন ব্যক্তি বোধ হয় যৌক্তিক অর্থনৈতিক অঙ্কে প্রচালিত হয় ও পুঁজিতান্ত্রিক সমাজের ভাঙন অনুসারে দৃষ্ট হয়ঃ “ বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি পুঁজিতন্ত্রী, শিল্পোদ্যোগী, শ্রমজীবি, উৎপাদনকারী এবং উপভোক্তা যে কোনটাই হতে পারে।” ঐ p. 174। ক্রুশো আবার কোথাও গদ্যময় ছকে-বাঁধা চরিত্র। “ আমাদের রবিন্সন ক্রুশো তাই আগে থেকে ঠাহর না করে কোন যন্ত্র বানাতে যাবে না;  তাঁর সন্তুষ্টিমতো নির্দিষ্ট শ্রম সময় বাঁচিয়ে বা একই শ্রমে সমপরিমান সন্তুষ্টি বাড়িয়ে কাজ সম্পূর্ণ করবে” ঐ p. 175 ।সম্ভবত ঐ দৃঢ় উক্তিগুলি মার্ক্সকে আকৃষ্ট করেছিল।         
 ৩৩ Marx, Grundrisse, পূর্বোল্লেখ., p. 85.
৩৪ Karl Korsch, Karl Marx. London: Chapman & Hall, 1938, p. 78f.
৩৫ Marx, Grundrisse, পূর্বোল্লেখ ., p. 85.

৩৬  John Stuart Mill, Principles of Political Economy, vol. I. London: Routledge & Kegan Paul, 1965, p. 55. মিল বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছেন  p. 55f.
৩৭ঐ p. 591.
৩৮ ঐ p. 249. মার্ক্স আগেই ‘দারিদ্র্যের দর্শন’-এ অর্থশাস্ত্রবিদদের ইতিহাস চেতনার অভাবের কথা লিখেছেন।“অর্থশাস্ত্রবিদদের একটি মাত্র পদ্ধতি জানা আছে। তাদের কাছে প্রতিষ্ঠানগুলি দ্বিবিধ- কৃত্রিম ও প্রাকৃতিক। সামন্তবাদীদের প্রতিষ্ঠান কৃত্রিম , বুর্জোয়াদেরগুলি প্রাকৃতিক। এদিক থেকে তাদের ভাবনা ধর্মতত্ববিদদের মতো, যারা দুই প্রকার ধর্ম প্রতিষ্ঠা করেছে । যে  ধর্ম তাদের নয়, তা মনুষ্য–সৃষ্ট, আর তাদেরটি ঈশ্বরের অনুকৃতি। অর্থশাস্ত্রবিদরা বলে বর্তমান সময়ে সম্পর্কগুলি অর্থাৎ বুর্জোয়া সম্পর্কগুলিঈশ্বরের অনুকৃতি এবং স্বাভাবিক। তার মানে দাঁড়ায় যে সম্পর্ক ঘিরে সম্পদ সৃষ্টি হচ্ছে ও উৎপাদিকা শক্তি বিকশিত হচ্ছে, তা প্রকৃতির নিয়মের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। এই সম্পর্কগুলি সময়ের প্রভাব-নিরপেক্ষ ও প্রকৃতির নিয়ম। এরা চিরন্তন আইন যা নিশ্চয়ই সমাজ চালিত করে। এর কোন ইতিহাস ছিল না, হবেও না”, MECW, vol. 6, p. 174.
৩৯ Marx, Grundrisse, পূর্বোল্লেখ., p. 460.
৪০ ঐ
৪১ ঐ., p. 675.
৪২  ঐ., p. 278.
৪৩ ঐ., p. 489.
৪৪ ঐ., p. 239.
৪৫ ঐ., p. 535.
৪৬ ঐ., p. 156.
৪৭ ঐ., p. 248.
৪৮ Marx, Capital, Volume III, পূর্বোল্লেখ., p. 240.
৪৯ Marx, Grundrisse, পূর্বোল্লেখ., p. 832.
৫০ Karl Marx to Friedrich Engels, 20 January 1857, in MECW, vol. 40, p. 93.
৫১ Karl Marx to Friedrich Engels, 2 April 1858, in MECW, vol. 40, p. 303.
৫২ Karl Marx to Friedrich Engels, 18 March 1857, in MECW, vol. 40, p. 106.
 ৫৩ Karl Marx to Friedrich Engels, 23 January 1857, in MECW, vol. 40, p. 99.
৫৪ Karl Marx to Joseph Weydemeyer, 1 February 1859, in MECW, vol. 40, p. 374.
৫৫ Karl Marx to Friedrich Engels, 31 October 1857, in MECW, vol. 40, p. 198.
৫৬ Karl Marx to Friedrich Engels, 8 December 1857, in MECW, vol. 40, p. 214.
৫৭ Karl Marx to Friedrich Engels, 13 November 1857, in MECW, vol. 40, p. 199.
৫৮ Friedrich Engels to Karl Marx, 22 April 1857, in MECW, vol. 40, p. 122.
৫৯ Karl Marx to Friedrich Engels, 22 February 1858, in MECW, vol. 40, p. 272 যদিও তাঁরা বেশ কিছু চমকপ্রদ মন্তব্য করেছিলেন , এঙ্গেলস এন্সাইক্লোপেডিয়ার কাজটি ‘শুধুমাত্র বাণিজ্যিক যা স্বচ্ছন্দে অন্ত্যেস্টিযোগ্য’ সংজ্ঞা দিয়েছিলেন এঙ্গেলস। Friedrich Engels to Hermann Schlüter, 29 January 1891, in MECW, vol. 49, p. 113.
৬০Karl Marx to Friedrich Engels, 8 December 1857, পূর্বোল্লেখ ., p. 214.
 ৬১  Karl Marx to Friedrich Engels, 28 January 1858, in MECW, vol. 40, p. 255.
৬২ Karl Marx to Friedrich Engels, 22 February 1858, পূর্বোল্লেখ., p. 273. ঐ
৬৩ Karl Marx to Friedrich Engels, 22 May 1857, in MECW, vol. 40, p. 132.
 ৬৪ Karl Marx to Friedrich Engels, 8 July 1857, in MECW, vol. 40, p. 143.
৬৫  Friedrich Engels to Karl Marx, 11 July 1857, in MECW, vol. 40, p. 143.
৬৬ মার্ক্স ১৮৫৩ সালে  ভারত নিয়ে আরো আগে  বিশদভাবে লিখেছেন। দ্রষ্টব্য Irfan Habib, ‘Marx’s Perception of India’, and Prabhat Patnaik, ‘Appreciation: the Other Marx’, in Iqbal Husain (ed.), Karl Marx, on India. New Delhi: Tulika Books, 2006, pp. xix-liv and lv-lxviii. আরো দ্রষ্টব্য Aijaz Ahmad, ‘Marx on India: a Clarification’, in In Theory: Classes, Nations, Literatures. London: Verso, 1992, pp. 221-42.
৬৭ Karl Marx to Friedrich Engels, 14 January 1858, in MECW, vol. 40, p. 249 (এই চিঠির তারিখ ভুলক্রমে লেখা ১৬ জানুয়ারী ১৮৫৮).
৬৮ Karl Marx to Friedrich Engels, 15 August 1857, in MECW, vol. 40, p. 152. 69 Karl Marx to Friedrich Engels, 14 January 1858, পূর্বোল্লেখ., p. 249. 70 ঐ., p. 86. 71 ঐ., p. 100.
৬৯ Karl Marx to Friedrich Engels, 14 January 1858, পূর্বোল্লেখ.,, p. 249. 70 ঐ., p. 86. 71ঐ, p. 100.
৭০ ঐ., p. 86. ৭১ ঐ., p. 100.
৭২ ঐ.., pp. 100-1.
৭৩  উদাহরণস্বরূপ, আলতুসে, নেগ্রি ও ডেল্টা হ্বোল্পের ব্যাখ্যাকে মার্ক্সীয় পদ্ধতি বলা ভ্রমাত্মক পর্যায়ের । দ্রস্টব্য  যেমন Louis Althusser and Étienne Balibar, Reading Capital. London: Verso, 1979, pp. 87-8; Antonio Negri, Marx beyond Marx: Lessons on the Grundrisse. New York: Autonomedia, 1991, p. 47; Galvano Della Volpe, Rousseau e Marx. Atlantic Highlands, N.J.: ব্যাখ্যা , p. 191. 1979Humanities Press, Evald Ilyenkov, Louis Althusser, Antonio Negri and Galvano Della Volpe, যেমন, ভ্রমাত্মক পর্যায়ের  Capital.Marx’s Dialectics of the Abstract & the Concrete inequating this with Marx’s method. দ্রস্টব্য Ilyenkov, Moscow: Progress Publishers, 1982, p. 100; Louis Althusser, Reading Capital, পূর্বোল্লেখ.., pp. 87-8; Antonio Negri, -For a critique of Della Volpe, see Cesare Luporini, ‘Il circolo concreto , op. cit., p. 47. Marx beyond Marx. Bari: De Donato, 1973, 1971)-Marxismo e filosofia in Italia (1958, in Franco Cassano (ed.), concreto’-astratto39. -pp. 226
 ৭৪ Marx, Grundrisse, পূর্বোল্লেখ.. p. 101.   
৭৫ Mario Dal Pra, La dialettica in Marx. Bari: Laterza, 1965, p. 461.
৭৬Marx, Grundrisse, পূর্বোল্লেখ., pp. 101-2. বস্তুত  মার্ক্সের ব্যাখ্যা হেগেলের দর্শণের প্রতি সুবিচার করে নি। শেষোক্তের রচনায় বেশ কিছু অনুচ্ছেদে দেখা যায় যে ইয়োহান গৎলিয়েভ ফিক্তের অতীন্দ্রিয় ব্যাখ্যা ও ফ্রিড্রিশ শেলিংএর বিষয়মুখ আদর্শবাদের মত তাঁর চিন্তা জ্ঞানের গতিকে প্রকৃতির চরিত্র বলে ঘুলিয়ে দেয় নি।দ্রস্টব্য  Judith Jánoska, Martin Bondeli, Konrad Kindle and Marc Hofer, Das ‘Methodenkapitel’ von Karl Marx. Basel: Schwabe & Co., 1994, pp. 115-19; এবং Musto, 'Introduction', Musto (ed.), Karl Marx’s Grundrisse: Foundations of the Critique of Political Economy 150 Years Later, পূর্বোল্লেখ., pp. 17-18.
৭৭ Marx, Grundrisse, পূর্বোল্লেখ., p. 105.
৭৮ ঐ., p. 105.  
৭৯ ঐ., p. 106.
৮০ Stuart Hall, ‘Marx’s notes on method: A “reading” of the “1857 Introduction”’, Cultural Studies, vol. 17 (2003 [1974]), no. 2, p. 133. হল যথার্থই টিকানির্দেশ করেছেন যে ইতিহাসবাদের সঙ্গে মার্ক্স- উদ্ভাবিত তত্বের বিচ্ছেদ হলেও ঐতিহাসিক সত্যনিষ্ঠ।  .
৮১ Marx, Grundrisse, পূর্বোল্লেখ., p. 105.
৮২Marx, Grundrisse, পূর্বোল্লেখ., p. 107.
৮৩  Marx, Capital, Volume III, পূর্বোল্লেখ., p. 804.
৮৪ Marx, The Poverty of Philosophy, পূর্বোল্লেখ., p. 172.
৮৫ Althusser and Balibar, Reading Capital, পূর্বোল্লেখ., pp. 47-8, 87.

৮৬ মার্ক্সের পদ্ধতির জটিলতার হেতু যে তিনি নিজেই সংশ্লেষণ করেছেন, তা বোঝা যায় তাঁর অনুসারীদের (এঙ্গেলসসহ) ভ্রান্ত ব্যাখ্যানে। আপাতচক্ষে ১৮৫৭ সালে তাঁর থিসিসের ‘উপক্রমনিকা’ পড়েন নি এঙ্গেলস ,যিনি ১৮৫৭ সালে ‘রাজনৈতিক অর্থনীতির সমালোচনা’র প্রতিবেদন’এর সমালোচনা-নিবন্ধে লেখেন মার্ক্স একবার তাঁর পদ্ধতি বিশদভাবে বর্ণনা করার পরে তিনি রাজনৈতিক অর্থনীতির সমালোচনা লেখা শুরু করতে পারতেন দু’ভাবেঃ ‘ইতিহাসগতভাবে বা যুক্তিগতভাবে’। কিন্তু যেহেতু ‘ইতিহাস প্রায়শ লাফিয়ে লাফিয়ে ও আঁকাবাঁকা পথে এগোয়, তাকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অনুসরণ করতে হয়...। উপযোগী কেবল যৌক্তিক পদ্ধতিই।’ এঙ্গেলসের সিদ্ধান্ত ভ্রান্ত কারণ আসলে  তা ‘ইতিহাসগত পদ্ধতি ছাড়া কিছু নয়, ইতিহাসগত পদ্ধতি শুধু ইতিহাসগত রূপ–রহিত ও সম্ভাব্য ঘটনায় হস্তক্ষেপ-অপারগ। ইতিহাস শুরু হয় যেখানে চিন্তাপ্রবাহেরও সূত্রপাত ঘটে এবং অগ্রগতি তার সঙ্গতিপূর্ণ বিমূর্ত ও ঔপপত্তিক প্রতিফলনে’।  Karl Marx, A Contribution to the Critique of Political Economy, in MECW, vol. 29, p. 475। সংক্ষেপে বলতে হলে এঙ্গেলস ইতিহাস ও যুক্তির মধে সমান্তরালতা বিদ্যমান মনে করেছিলেন। মার্ক্স তা ‘উপক্রমনিকা’য় আদ্যন্ত নস্যাৎ করেছিলেন। এঙ্গেলসের ধারণা মার্ক্সের বলে চাপিয়ে দিয়ে মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী ব্যাখ্যায়ন এই অবস্থানকে আরো বন্ধ্যা ও যান্ত্রিক করে তুলেছে।           
৮৭ Marx, Grundrisse, পূর্বোল্লেখ., p. 109      
৮৮ ঐ, p. 110.
৮৯ ঐ, p. 111.  ফ্রিড্রিশ থিওডর ভিশার (১৮০৭-১৮৮৭) তাঁর Aesthetics, or the Science of the Beautiful (1846-1857) এ আলোচনা করেছিলেন কিভাবে পুঁজিতন্ত্রের শক্তিবলে মিথগুলি দ্রবীভূত হয় । ঐ গ্রন্থ মার্ক্সকে তাঁর কাজ ও খাতাপত্র সার সংক্ষেপনে প্রেরণা যুগিয়েছিল, তিন মাসের মধ্যে লিখে ফেলতে পেরেছিলেন (‘উপক্রমনিকা’)। কিন্তু দুজনের অবলোকন পরস্পর অন্যতর হতেই পারত, কেন না ভিশারের চোখে পুঁজিতন্ত্র ছিল অপরিবর্তনীয়, মূলত কথাশিল্পী ভিশার পুঁজিতন্ত্রের নন্দনতাত্বিক নির্বিত্ত করণের সংস্কৃতিকে  রোমান্তিকতার আদলে ব্যাখ্যা করেছেন। মার্ক্স পুঁজিতন্ত্রের অবসানের জন্য অবিচল সংগ্রাম  করে গেছেন,  বস্তুগতভাবে  ও তত্বগত ভাবে জোর দিয়েছেন তাঁর মৌলিক ব্যাখ্যায় যে পূর্বেকার উৎপাদন প্রণালীর চেয়ে পুঁজিতন্ত্র আরও অগ্রগত। সূত্র Georg Lukács, ‘Karl Marx und Friedrich Theodor Vischer’, in Beiträge zur Geschichte der Ästhetik, Berlin: Aufbau Verlag, 1956, pp. 267-8.
৯০ Marx, Grundrisse, পূর্বোল্লেখ., p. 109.
৯১ Marx, A Contribution to the Critique of Political Economy, in MECW, vol. 29, p. 263.
৯২ এই তথ্যের সমর্থন মেলে ‘পুঁজি’র ফরাসী সংস্করণে (১৮৭২-৭৫) জর্মন শব্দ bedingen (যার অর্থ ‘নির্ধারণকারী’ বা ‘শর্তসৃজনকারী’) মার্ক্স ব্যবহৃত শব্দ domineer। মার্ক্স লিখেছিলেন, ‘‘Le mode de production de la vie matérielle domine [dominates] en général le développement de la vie sociale, politique et intellectuelle’ বাংলা তর্জমা করলে দাঁড়ায়- ‘বাস্তব জীবন নির্মাণ সাধারণত সামাজিক, রাজনৈতিক ও বৌদ্ধিক বিকাশ প্রভাবিত করে’। দ্রষ্টব্য Karl Marx, ‘Le Capital’, MEGA² II/7, p. 62 । আদতে তাঁর লক্ষ্য ছিল দুটি বিষয়ের মধ্যে যান্ত্রিক সম্পর্ক স্থাপন এড়িয়ে যাওয়া। সূত্র Maximilien Rubel, Karl Marx. Essai de biographie intellectuelle, Paris: Rivière, 1971, p. 298।    
৯৩ নিকৃষ্টতম ও ব্যাপক প্রচারিত ব্যাখ্যা ইয়ুসিফ স্তালিন-এর ‘দ্বান্দ্বিক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদ’এ ঃ ‘বস্তুবাদীদুনিয়া বিষয়মুখ বাস্তবতার প্রতিফলন...(ও) সমাজের আধ্যাত্মিক জীবন এই বিষয়মুখ বাস্তবতার প্রতিফলন’ এবং সমাজে যাই আছে, সমাজের বস্তুজীবনের অবস্থা যাই হোক এই ধারণাগুলি, তত্ত্বাদি ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলি সমাজেরই।’ Joseph Stalin, Dialectical and Historical Materialism, London: Lawrence & Wishart, 1941, p. 15.
৯৪ Karl Marx to Ferdinand Lassalle, 22 February 1858, in MECW, vol. 40, pp. 270-1
৯৬ Friedrich Engels to Karl Marx, 29 October 1857, in MECW, vol. 40, p. 195.
৯৭  Friedrich Engels to Karl Marx, 15 November 1857, in MECW, vol. 40, p. 200.
৯৮  Friedrich Engels to Karl Marx, 31 December 1857, in MECW, vol. 40, p. 236.
৯৯Jenny Marx to Conrad Schramm, 8 December 1857, in MECW, vol. 40, p. 566.
১০০ 100 Friedrich Engels to Karl Marx, 6 January 1858, in MECW, vol. 40, p. 239.
১০১ Karl Marx to Friedrich Engels, 1 February 1858, in MECW, vol. 40, p. 258.
১০২ Karl Marx to Friedrich Engels, 11 January 1858, in MECW, vol. 40, p. 244.
১০৩ Karl Marx to Ferdinand Lassalle, 22 February 1858, পূর্বোল্লেখ., p. 268.
১০৪ Karl Marx to Friedrich Engels, 14 January 1858, পূর্বোল্লেখ., p. 247.
১০৫ Karl Marx to Friedrich Engels, 29 March 1858, in MECW, vol. 40, p. 295.
১০৬ Karl Marx to Friedrich Engels, 2 April 1858, পূর্বোল্লেখ., p. 296.
১০৭ Karl Marx to Ferdinand Lassalle, 21 December 1857, পূর্বোল্লেখ., p. 255.
১০৮ Karl Marx to Conrad Schramm, 8 December 1857, পূর্বোল্লেখ., p. 217.
১০৯  Karl Marx to Friedrich Engels, 22 February 1858, পূর্বোল্লেখ., p. 274.  
তর্জমা- ‘আমার ক্লেশ একারণেই’
 ১১০ Karl Marx to Friedrich Engels, 23 January 1858, in MECW, vol. 40, p. 252.
১১১ Karl Marx to Friedrich Engels, 29 March 1858, পূর্বোল্লেখ., p. 296.
 ১১২  তর্জমা- ‘আমি অভদ্র জনতাকে ঘৃণা করি,  এড়িয়ে চলি’: David Mulroy, Horace’s Odes and Epodes. Ann Arbor: University of Michigan Press, 1994, p. 127.
১১৩   Karl Marx to Ferdinand Lassalle, 22 February 1858, পূর্বোল্লেখ., p. 268.
১১৪  Karl Marx to Ferdinand Lassalle, 31 May 1858, in MECW, vol. 40, p. 323.
১১৫ Friedrich Engels to Karl Marx, 17 March 1858, in MECW, vol. 40, pp. 289–90.
১১৬ Friedrich Engels to Karl Marx, 17 March 1858, পূর্বোল্লেখ., p. 289.
১১৭ Friedrich Engels to Karl Marx, 11 February 1858, in MECW, vol. 40, p. 265.
১১৮ Karl Marx to Friedrich Engels, 14 February 1858, in MECW, vol. 40, p. 266.
১১৯ Jenny Marx to Friedrich Engels, 9 April 1858, in MECW, vol. 40, p. 569.
১২০ Karl Marx to Friedrich Engels, 23 April 1857, in MECW, vol. 40, p. 125.
১২১ Karl Marx to Friedrich Engels, 29 April 1858, in MECW, vol. 40, p. 309. তর্জমা- ‘আমার ক্লেশ একারণেই’  Terence, Andria. Bristol: Bristol Classical Press, 2002, p. 99.
১২২ Karl Marx to Ferdinand Lassalle, 31 May 1858, পূর্বোল্লেখ., p. 321.
১২৩ Karl Marx to Friedrich Engels, 1 May 1858, in MECW, vol. 40, p. 312.
১২৪ Karl Marx to Friedrich Engels, 31 May 1858, পূর্বোল্লেখ., p. 317.
১২৫ Karl Marx to Friedrich Engels, 21 September 1858, in MECW, vol. 40, p. 341.
১২৬ Karl Marx to Friedrich Engels, 15 July 1858, in MECW, vol. 40, p. 328.
 ১২৭ ঐ. pp. 328-31.
১২৮ Karl Marx to Joseph Weydemeyer, 1 February 1859, পূর্বোল্লেখ., p. 374
১২৯ ১৮৫৭-র প্রধান ঘটনাবলী বিষয়ে  দ্রস্টব্য James Sloan Gibbons, The Banks of New-York, Their Dealers, Their Clearing-House, and the Panic of 1857. New York: Appleton & Co., 1859, esp. pp. 343-99; D. Morier Evans, The History of the Commercial Crisis, 1857-58. New York: Burt Franklin, 1860; Charles W. Calomiris and Larry Schweikart, ‘The Panic of 1857: Origins, Transmission, and Containment’, Journal of Economic History, vol. 51 (1991), no. 4, pp. 807–34.
১৩০ Karl Marx to Friedrich Engels, 13 August 1858, in MECW, vol. 40, p. 338
১৩১ Friedrich Engels to Karl Marx, 7 October 1858, in MECW, vol. 40, p. 343.
১৩২ Karl Marx to Friedrich Engels, 11 December 1858, in MECW, vol. 40, p. 360.
 ১৩৩ Friedrich Engels to Karl Marx, 7 October 1858, পূর্বোল্লেখ., p. 343.
 ১৩৪ Karl Marx to Friedrich Engels, 8 October 1858, in MECW, vol. 40, p. 345.
 ১৩৫ Karl Marx to Friedrich Engels, 8 October 1858, পূর্বোল্লেখ.., p. 347.
১৩৬ Karl Marx to Joseph Weydemeyer, 1 February 1859, পূর্বোল্লেখ.., p. 374.
১৩৭ Karl Marx to Friedrich Engels, 1 February 1858, পূর্বোল্লেখ., p. 258.
১৩৮ Karl Marx to Friedrich Engels, 8 October 1858, পূর্বোল্লেখ.., p. 346.
১৩৯ Karl Marx, ‘Mazzini’s new manifesto’, in MECW, vol. 16, p. 37.
১৪০ Karl Marx to Friedrich Engels, 24 November 1858, in MECW, vol. 40, p. 356.
১৪১ Karl Marx to Friedrich Engels, 2 November 1858, in MECW, vol. 40, p. 351.
১৪২ Karl Marx to Joseph Weydemeyer, 1 February 1859, পূর্বোল্লেখ., p. 37